■ লেখক: মো: মহিউদ্দিন হেলাল (সম্পাদক পর্যটন বিচিত্রা)
পর্যটন শিল্প একটি গতিশীল খাত, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রকল্প, নীতিমালা, বিনিয়োগ কিংবা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের পর্যটন অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বৈশ্বিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে । তাই শুধুমাত্র সংবাদ পরিবেশন করাই যথেষ্ট নয়; বরং একটি সংবাদের পেছনের প্রেক্ষাপট, এর ধারাবাহিক অগ্রগতি, সম্ভাব্য প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা বিশ্লেষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায়, পর্যটন বিচিত্রার এই সংখ্যায় শুরু হলো ‘পর্যটন সংবাদ বিশ্লেষণ’ বিভাগ। সাম্প্রতিক পর্যটন সংবাদের বিশ্লেষণ ও নিয়মিত প্রকাশে সচেষ্ট থাকবে পর্যটন বিচিত্রা ।
বর্তমান সরকারের প্রারম্ভিক উদ্যোগে, বাংলাদেশের পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাজেট বরাদ্দ, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর অগ্রগতি, ঢাকা-নারিতা সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু এবং নতুন আন্তর্জাতিক গেটওয়ে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা-সবকিছুই একটি বৃহত্তর রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জনের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ, গন্তব্য ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর, প্রচার-প্রচারণা, এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। পরিকল্পনা নয়, সঠিক বাস্তবায়নই হবে আগামী দশকের প্রধান বাধা ও সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য
একটি জাতির পরিচয় শুধু তার অর্থনীতি, উন্নয়ন বা আধুনিক স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সম্মিলিত স্মৃতির ভাণ্ডারে। প্রাচীন স্থাপনা, জমিদারবাড়ি, মন্দির-মসজিদ, লোককাহিনী, উৎসব, খাদ্যসংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধারাবাহিকতাই একটি জাতির আত্মপরিচয়কে ধারণ করে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজ নানা কারণে হুমকির মুখে। সময়ের ক্ষয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, দখল এবং অসচেতনতার কারণে আমাদের অনেক মূল্যবান ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। একটি স্থাপনা বা নিদর্শন ধ্বংস হওয়া মানে শুধু কয়েকটি ইট-পাথরের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় ইতিহাসের একটি অধ্যায়, একটি জনপদের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জানার সুযোগ ।
পর্যটন বিচিত্রা বিশ্বাস করে, ঐতিহ্য সংরক্ষণ কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সকলের সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। একজন সচেতন নাগরিক, পর্যটক, গবেষক, শিক্ষার্থী কিংবা স্থানীয় বাসিন্দা- প্রত্যেকেই এই দায়িত্বের অংশীদার।
আমরা চাই, বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হোক জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র, প্রতিটি লোকজ উৎসব হোক সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির প্রতীক এবং প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ হোক টেকসই পর্যটনের অনুকরণীয় উদাহরণ। জমিদারবাড়ি, নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, গ্রামীণ মেলা এবং লোকঐতিহ্য আমাদের সেই সম্ভাবনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় । আজ যে ঐতিহ্যকে আমরা যত্নে রক্ষা করব, আগামী প্রজন্ম তা গর্বের সঙ্গে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবে । সংরক্ষিত ঐতিহ্য শুধু অতীতকে রক্ষা করে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং পর্যটন উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি অঙ্গীকার করি- ঐতিহ্য দেখব, জানব, ভালোবাসব এবং সংরক্ষণ করব। কারণ ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মারক নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যতেরও ভিত্তিI
আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় বাংলাদেশ অনুপস্থিতি- কতটা যৌক্তিক?
আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; এটি বিশ্ব পর্যটন শিল্পের সবচেয়ে কার্যকর বিপণন, ব্র্যান্ডিং এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড বেসরকারি উদ্দ্যোক্তাদের সমন্বয় অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অংশগ্রহণ করলেও দুঃখজনকভাবে, গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অংশগ্রহণ কার্যত অনুপস্থিত।
পর্যটন শিল্পে সাফল্য কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে কতটা কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায় তার ওপর। বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা যতই আশাবাদী হই না কেন, আন্তর্জাতিক বিপণনে অনুপস্থিত থাকলে সেই সম্ভাবনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় নিয়মিত, পরিকল্পিত ও পেশাদার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি । এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নেতৃত্বে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে দেশের পর্যটনকে বৈশ্বিক বাজারে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ।
১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় শুরু হচ্ছে ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৬
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের সাথে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আগামী সেপ্টেম্বর ১৭-১৯, ২০২৬ তারিখে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার (ATF Dhaka) ২০২৬ । পর্যটন বিচিত্রার ধারাবাহিক আয়োজনে প্রতিবছর এই মেলা আয়োজনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এন্ড্রোজমেন্ট (Endorsement) প্রদান করে এবং মন্ত্রণালয় অধীনস্থ সকল সংস্থা সার্বিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ করে থাকে।
আশা করছি এবছর ৩০০ শতাধিক স্টলে দেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটন প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন এয়ারলাইন্স, হোটেল, রিসোর্ট, টুরঅপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি, সরকারি পর্যটন সংস্থা, দূতাবাস সহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে আসন্ন ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৬ পর্যটন শিল্পের আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পরিণত করবে।
পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এবারের মেলার অংশ হিসাবে ২য় বারের মত “বাংলাদেশ ট্যুরিজম ইনভেস্টমেন্ট শোকেজ” অনুষ্ঠিত হবে। এই আয়োজনে পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ উপযোগী আসন্ন প্রকল্পসমূহ যেমন হোটেল, রিসোর্ট, ক্রুজলাইন ইত্যাদি উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া মেলার সাইড লাইন ইভেন্ট হিসেবে তিনদিন ব্যপী আয়োজন করা হবে সেমিনার, বিটুবি সেশন, পর্যটন শিল্পে ডেস্টিনেশন ও প্রোডাক্ট প্রেজেন্টেশন সহ নানাবিধ কার্যক্রম।
আশাকরি এই মেলাটি দেশ ও বিদেশের পর্যটন সেবা সংস্থা ও পর্যটকদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করবে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পর্যটন বিচিত্রার পক্ষ থেকে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান, ভ্রমণপ্রেমী এবং দর্শনার্থীদের দেশের সর্ববৃহৎ পর্যটন মেলা- ‘এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারে’ অগ্রিম আমন্ত্রণ।












