■ মো. শাহ আলম
বাংলাদেশের নদীপথে কিছু জাহাজ আছে, যেগুলো কেবল যাতায়াতের বাহন ছিল না। সেগুলো ছিল সময়ের সাক্ষী, মানুষের জীবনের অংশ। প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ ঠিক তেমনই এক নাম। একটা সময় ছিল, যখন নদীর বুকে ধোঁয়া তুলে ছুটে চলা এই জাহাজটিই দক্ষিণ বাংলার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন
গার্ডেন রিচ থেকে বাংলার নদীতে
পিএস মাহসুদের জন্ম ১৯২৮ সালে। কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে ব্রিটিশ শাসনামলের কারিগরি দক্ষতায় তৈরি হয়েছিল এই প্যাডেল স্টিমার। তখন উপমহাদেশজুড়ে নদীপথে দ্রুত যোগাযোগ গড়ে তোলার তোড়জোড় চলছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই একের পর এক স্টিমার নামানো হচ্ছিল বাংলার নদীতে। মাহসুদ ছিল বাষ্পচালিত। কয়লা জ্বালিয়ে বয়লারে পানি ফুটত, তৈরি হতো বাষ্প। সেই শক্তিতেই চলত ইঞ্জিন, আর দুই পাশের বিশাল প্যাডেল চাকা নদীর জল কেটে কেটে জাহাজকে এগিয়ে নিত।
নির্মাণের পর মাহসুদকে যুক্ত করা হয় বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে। কলকাতা, ঢাকা, চাঁদপুর, বরিশাল, খুলনা, মোরেলগঞ্জ- এই সব নাম অর যাত্রাপথের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, ডাকবাহী কর্মচারী আর সাধারণ যাত্রী-সবাই কোনো না কোনে সময় মাহসুদের ডেকে পা রেখেছে। ডাক, মালামাল, মানুষ সবই বহন করেছে এই জাহাজ। নদীর বুকে ভেসে চলা মহসুদ গ্রামের মানুষের কাছে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তখনো সড়ক নেই, সেতু নেই নদীই ছিল পথ, আর রকেট ছিল ভরসা।
রাষ্ট্র বদলায়, মাহসুদ থেকে যায়
ব্রিটিশ শাসন শেষ হলে পাকিস্তান আমলে মাহসুদ চলে যায় পূর্ব পাকিস্তান স্টিম নেভিগেশন সংস্থার অধীনে। আর ১৯৭১-এর পর স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিআইডব্লিউটিসি-এর বহুরে যুক্ত হয় এই ঐতিহাসিক জাহাজ। তখন বিআইডব্লিউটিসির হাতে ছিল প্রায় ১৩টি প্যাডেল স্টিমার। তার মধ্যে মহসুদ ছিল অন্যতম পরিচিত নাম।
সময় বদলাচ্ছিল, প্রযুক্তিও বদলাতে হচ্ছিল। ১৯৯৮৩ সালে বেলজিয়ামের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ডে মহসুদের বাষ্পচালিত ইঞ্জিন বদলে ডিজেল ইঞ্জিন বসানো হয়। ১৯৯৫ সালে যুক্ত হয় মেকানিক্যাল গিয়ার সিস্টেম। তবু জাহাজের শরীরজুড়ে লেগে ছিল পুরোনো দিনের ছাপ লোহার গারো নদীর ইতিহাস।
ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতা
সড়ক ও রেল যোগাযোগ বাড়তে থাকল। আধুনিক লঞ্চ এলো। মানুষের হাতে সময়ের অভাব। রকেট স্টিমারের গুরুত্ব কমতে শুরু করল। যেখানে একসময় প্রতিদিন মহসুদ চলত, সেখানে এখন অ চলে সপ্তাহে একদিন। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়ল, কম।
২০২২ সালের পর পদ্মা সেতু চালু হলে নদীপথের ওপর নির্ভরতা আরও কমে যায়। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি, লোকসান আর পুরোনো কাঠামোর সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় বিআইডব্লিউটিসি শেষ পর্যন্ত বা যাত্রী পরিবহন বন্ধ করে দেয়। বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা রকেট মাহসুদ যেন নিঃশব্দে অবসরে চলে যায়।
গল্পের শেষ হয়নি
কিন্তু মাহমুদের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। সরকার ও বিআইডব্লিউটিসি সিদ্ধান্ত নেয়, এই শতবর্ষী জাহাঙ্গ ধ্বংস নয়- সংরক্ষণ করা হবে। তিন বছর অচল পড়ে থাকার পর মাহসুদকে নতুন করে সাজানো হয়। কাঠামো ও ঐঐতিহাসিক নকশা অক্ষুন্ন রেখে যুক্ত কর হয় আধুনিক ইঞ্জিন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থ ও ডিজিটাল নেভিগেশন। ভেতরে তৈরি করা হয় একটি বিশেষ ‘হেরিটেজ কর্নার’- যেখানে রাখা হয়েছে পুরোনো নেভিগেশন যন্ত্র, নকশা, ছবি আর সেই সব মানুষের স্মৃতি, যার কোনো না কোনো সময় রকেটে চড়ে নদী পাড়ি দিয়েছিলেন।
ভাসমান ইতিহাস
আজ পিএস মাহসুদ আর শুধু একটি জাহাজ নয়। এটি একটি অসমান ইতিহাস জাদুঘর। পর্যটকরা এখানে এসে শুধু নদীভ্রমণ করেন না- অরা ছুঁয়ে দেখেন এক শতাব্দীর ইতিহাস। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি হয়ে উঠছে নদীনির্ভর বাংলার অনন্য পরিচয়। দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মনুষের জীবনের বড় বড় মুহূর্ত জড়িয়ে আছে এই জাহাজের সঙ্গে- কেউ ছাত্রজীবনে ঢাকায় পড়তে এসেছে, কেউ ব্যবসার মাল পাঠিয়েছে, কেউ ঈদে বাড়ি ফিরেছে। সেই স্মৃতিগুলো আজ আর নদীতে ভাসে না, কিন্তু মাহমুদের গায়ে লেগে আছে।












