■ মহিউদ্দিন হেলাল (সম্পাদক পর্যটন বিচিত্রা)
স্মৃতিসৌধ থেকে জমিদারবাড়ি, নদী থেকে লোককাহিনী বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য যাত্রা। কিছু ভ্রমণ আছে, যা শুধু একটি গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়; বরং সময়ের ভেতর দিয়ে নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য ৷ মানিকগঞ্জের যাত্রা ঠিক তেমনই এক অভিজ্ঞতা- যেখানে প্রতিটি পথ ইতিহাসের দিকে নিয়ে যায়, প্রতিটি নদী বহন করে শতাব্দীর স্মৃতি, আর প্রতিটি স্থাপনা বলে যায় বাংলার এক বিস্মৃত অধ্যায়ের গল্প।
ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে ঢাকা শহরের কংক্রিটের দেয়াল ছুঁয়ে জেগে ওঠে, তখন রাজধানীর ব্যস্ততা পেছনে ফেলে যাত্রা শুরু হয় এক অতীত বাংলার দিকে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ালে স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গ করা বীরদের স্মৃতি হৃদয়ে অনুরণিত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সেই গৌরবগাথা যেন এই ভ্রমণের প্রথম পাঠ।
এরপর পথ এগিয়ে যায় ধামরাইয়ের দিকে- একটি জনপদ, যার ইতিহাস অন্তত চারশ বছরের পুরোনো । মুঘল আমল থেকেই ধামরাই ছিল কারুশিল্প ও বাণিজ্যের কেন্দ্র আজও কাঁসা-পিতলের কারখানাগুলো থেকে ভেসে আসে তৈজসপত্রের ছন্দময় ধ্বনি; মনে হয়, শতাব্দী পেরিয়েও কারিগরদের হাতের শিল্প হারিয়ে যায়নি।
এরপরই শুরু হয় মানিকগঞ্জ- নদী, জমিদারবাড়ি, স্থাপত্য, লোককাহিনী ও লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। বাংলাদেশের প্রশাসনিক মানচিত্রে মানিকগঞ্জ একটি জেলা হলেও ইতিহাসের মানচিত্রে এটি বহু শতাব্দীর জনপদ । ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ প্রশাসন মানিকগঞ্জ মহকুমা প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়। কিন্তু এর ইতিহাস আরও প্রাচীন। পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও ইছামতীর প্রবাহ হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডের অর্থনীতি, কৃষি, জনবসতি ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত
করেছে।
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে নদীপথ ছিল পূর্ববঙ্গের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। তখন মানিকগঞ্জের ঘাটগুলো ছিল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র । কলকাতা, ঢাকা ও রাজশাহীর সঙ্গে নৌপথে চলত পাট, গুড়, ধান ও নিত্যপণ্যের ব্যবসা। নদীতে ভেসে বেড়াত পালতোলা নৌকা, পণ্যবাহী বাজরা এবং জমিদারদের সুসজ্জিত নৌবহর। ভাটিয়ালির সুরে মুখর সেই নদীজীবনের অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও তার স্মৃতি আজও বাতাসে মিশে আছে । আজও বর্ষার বিকেলে নদীর ধারে দাঁড়ালে মনে হয়, ইতিহাসের সেই জলযানগুলো বুঝি দিগন্তের ওপার থেকে ভেসে আসবে। মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক বালিয়াটি জমিদারবাড়ি । সাটুরিয়ার নিস্তব্ধ গ্রামে অবস্থিত এই প্রাসাদ কমপ্লেক্স শুধু একটি জমিদারবাড়ি নয়; এটি বাংলার জমিদারি ইতিহাসের এক মহাকাব্য। আঠারো শতকের শেষভাগে সাহা পরিবারের উত্থান শুরু হয়। ব্যবসায়িক সাফল্যের মাধ্যমে তারা জমিদারি লাভ করেন এবং ১৮৬০ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে নির্মাণ করেন সাতটি পৃথক প্রাসাদ।
প্রায় ২০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্স একসময় পূর্ববঙ্গের অন্যতম সমৃদ্ধ জমিদারি কেন্দ্র ছিল। ইউরোপীয় নব্য-ধ্রুপদী স্থাপত্য, করিন্থীয় স্তম্ভ, অলংকৃত খিলান, বিশাল বারান্দা ও দরবার হল আজও সেই জৌলুসের সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর প্রাসাদগুলোর প্রশাসনিক ভূমিকার অবসান ঘটে। কিন্তু ইতিহাসের কাছে তাদের গুরুত্ব কমে যায়নি। দুপুরের আলো যখন প্রাসাদের দেয়ালে নরম ছায়া আঁকে, তখন মনে হয় যেন কোনো জমিদারবধূর পালকি এখনও উঠোন পেরিয়ে যাবে, অথবা দরবার কক্ষে আবার শুরু হবে কোনো সাংস্কৃতিক আসর। একসময় এখানে অনুষ্ঠিত হতো নৃত্যসভা, সঙ্গীতানুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ এবং অভিজাত অতিথিদের সংবর্ধনা। তবে মানিকগঞ্জের গল্প শুধু বালিয়াটিতে শেষ হয় না।
পদ্মার পাড়ে তেওতা জমিদারবাড়ি আজও অতীতের আভিজাত্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই জমিদারবাড়ি প্রায় ১৮২০ থেকে ১৮৮০ সালে দেশীয় ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব সমন্বয়ে নির্মিত। ক্ষয়প্রাপ্ত দেয়ালের গায়ে সময়ের ছাপ স্পষ্ট, তবুও তার সৌন্দর্য ম্লান হয়নি। একসময় পদ্মার তীরবর্তী এই প্রাসাদ ছিল অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের আবাস। এখানে কবি, কীর্তনশিল্পী ও সংস্কৃতিবান ব্যক্তিদের নিয়মিত সমাগম ঘটত। বিকেলের সোনালি আলোয় তেওতার বারান্দা আর পদ্মার জলরেখা মিলেমিশে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। মনে হয়, ইতিহাস এখানে বইয়ের পাতায় নয়- বাতাসে, আলোয় আর নীরবতায় বেঁচে আছে। গড়পাড়ার নাম আজ খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু উনিশ শতকে এটি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পুরোনো দালান, মন্দির, পুকুরঘাট ও জমিদারি নিদর্শনগুলো আজও সেই অতীতের স্মৃতি বহন করে। ভগ্নপ্রায় দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে যেন শোনা যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষের পদচারণা। কিন্তু মানিকগঞ্জের ঐতিহ্য কেবল স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত প্রাণ লুকিয়ে আছে মানুষের জীবনযাত্রা, উৎসব ও লোকসংস্কৃতিতে।
কার্তিকের আকাশে যখন পূর্ণিমার আলো ঝরে পড়ে, তখন বেতিলার রাসমেলা প্রাণ ফিরে পায়। স্থানীয় গবেষকদের মতে চার থেকে পাঁচ শতাব্দী পুরোনো অর্থাৎ ষোড়শ কিংবা সপ্তদশ শতকে শুরু হওয়া এই মেলা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি লোকসংস্কৃতির এক মহামিলন । যাত্রাপালা, পালাগান, নাগরদোলা, গ্রামীণ হাট আর লোকজ পণ্যের সমারোহে মেলার মাঠ যেন এক চলমান লোকজ জাদুঘরে পরিণত হয়।
অন্যদিকে ধামরাইয়ের রথযাত্রার ইতিহাসও অন্তত চারশ বছরের। আষাঢ় মাসে ধামরাইয়ের রথযাত্রা আবার অন্য এক আবহ তৈরি করে। বিশাল কাঠের রথ, হাজারো মানুষের টান, শঙ্খধ্বনি ও উৎসবের উচ্ছ্বাস উপমহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যকে আজও জীবন্ত
রাখে । লোকগানও মানিকগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় গ্রামের মেলাগুলোতে “বেহুলা-লখিন্দর”রাতভর চলত যাত্রাপালা। “সিরাজউদ্দৌলা” কিংবা “ নবাব সিরাজ”-এর মতো পালা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাত। বাউল, জারি, সারি ও কবিগানের ঐতিহ্য আজও গ্রামীণ জনজীবনে টিকে আছে।
মানিকগঞ্জের খাদ্যসংস্কৃতিও কম আকর্ষণীয় নয়। শীতের ভোরে খেজুর গাছ থেকে নামানো রস, সেই রস থেকে তৈরি বিখ্যাত হাজারী গুড়, ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা, আর পদ্মার তাজা মাছ- সব মিলিয়ে এই জনপদ রসনাবিলাসীদের জন্যও এক অনন্য গন্তব্য।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে, জমিদারদের প্রাসাদ নীরব হয়েছে, মেলার রূপও কিছুটা পাল্টেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানিকগঞ্জ এখনও তার আত্মাকে হারায়নি। এখানকার নদী, লোককাহিনী, উৎসব ও স্থাপত্য এখনও বাংলার অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। তাই মানিকগঞ্জে ভ্রমণ মানে শুধু কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা নয়। এটি এক ধরনের সময়ভ্রমণ- যেখানে সাভারের স্মৃতিসৌধ থেকে ধামরাইয়ের কারুশিল্প, বালিয়াটির রাজকীয় প্রাসাদ থেকে তেওতার নদীতীর, বেতিলার মেলা থেকে শীতের খেজুর রস- সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জ যেন বাংলার এক জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ।
হয়তো দিন শেষে আপনি ফিরে আসবেন ঢাকার ব্যস্ত জীবনে, কিছু ছবি নিয়ে, কিছু স্মৃতি নিয়ে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা- ফিরবেন নিজের শিকড়কে নতুন করে আবিষ্কারের এক গভীর অনুভূতি নিয়ে। এটাই মানিকগঞ্জের আসল আকর্ষণ; এটাই ঐতিহ্য ভ্রমণের প্রকৃত প্রাপ্তি।
দিনব্যাপী ভ্রমণসূচি
যারা অল্প সময়ে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্য ঘুরে দেখতে চান, তাদের জন্য একটি দিনব্যাপী ভ্রমণ পরিকল্পনা হতে পারে- (ঢাকা-স্মৃতিসৌধ-ধামরাই-বালিয়াটি-গড়পাড়া-
তেওতা-ঢাকা)
সকাল ৭:০০ ঢাকা থেকে যাত্রা
সকাল ৮:০০ জাতীয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন
সকাল ৯:০০ সকাল ৮:০০ জাতীয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন
সকাল ১১:০০ বালিয়াটি জমিদারবাড়ি ও জাদুঘর পরিদর্শন
দুপুর ১:০০ স্থানীয় খাবারের মধ্যাহ্নভোজ
দুপুর ২:৩০ গড়পাড়া ঐতিহাসিক এলাকা
দুপুর ৪:০০ তেওতা জমিদারবাড়ি ও পদ্মা নদীতীর দর্শন
বিকাল ৫:৩০ স্থানীয় বাজার ও গ্রামীণ জীবন পর্যবেক্ষণ
বিকাল ৬:০০ ঢাকার উদ্দেশে রওনা
রাত ৮:০০ঢাকায় প্রত্যাবর্তন
হাজারী গুড়: শীতের মিষ্টি ঐতিহ্য
শীত এলে মানিকগঞ্জের গ্রামগুলোতে শুরু হয় খেজুর রস সংগ্রহের উৎসব। এই রস থেকে তৈরি হয় বিখ্যাত হাজারী গুড়। ঘন সুবাস, গাঢ়? রং এবং অনন্য স্বাদের জন্য এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাদৃত। অনেক পর্যটক শীতকালে শুধু এই গুড় সংগ্রহের জন্যই মানিকগঞ্জে আসেন।
ইতিহাস থেকে
* বালিয়াটি জমিদারবাড়ির প্রধান প্রাসাদগুলোর নির্মাণকাল আনুমানিক ১৮৬০-১৯১৫ সাল।
* বালিয়াটি জমিদারবাড়ির জমিদারি কার্যক্রম প্রায় ১৭৯০-এর দশক থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
* মানিকগঞ্জ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৪৫ সালে এবং জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৮৪ সালে।
* বেতিলা রাসমেলার ইতিহাস প্রায় ৪০০-৫০০ বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়।
* ধামরাই রথযাত্রার ঐতিহ্য অন্তত ৪০০ বছর ধরে টিকে আছে।
* ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বালিয়াটি ও তেওতার জমিদারবাড়িগুলো তাদের প্রশাসনিক ভূমিকা হারায়।
পর্যটনে সম্ভাবনা
মানিকগঞ্জ হেরিটেজ ট্যুরিজম সার্কিট: সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ-ধামরাই- বালিয়াটি জমিদারবাড়ি-গড়পাড়া- তেওতা জমিদারবাড়ি-আরিচা ঘাটকে সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত — হেরিটেজ ট্যুরিজম সার্কিট’ গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পর্যটকরা একদিন বা দুইদিনে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নদীভিত্তিক পর্যটনের সমন্বিত অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার
ঐতিহ্য কেবল অতীতের স্মারক নয়; এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ । বালিয়াটি, তেওতা, গড়পাড়া কিংবা বেতিলার মতো স্থাপনাগুলো শুধু মানিকগঞ্জের সম্পদ নয়, সমগ্র বাংলাদেশের ঐতিহ্য।
ভ্রমণে গেলে –
* দেয়ালে লিখবেন না।
* ময়লা ফেলবেন না।
* প্রত্নসম্পদ স্পর্শ বা ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না।
* স্থানীয় গাইড ও উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করবেন।
* স্থানীয় পণ্য কিনে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করবেন।












