■ মহিউদ্দিন হেলাল
বর্ষার সকালে নদীর বুকে যখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে একটি নতুন কবিতা লেখা শুরু করেছে। সেই কবিতার প্রতিটি শব্দ জল, প্রতিটি পঙ্ক্তি সবুজ, আর প্রতিটি বিরতিতে লুকিয়ে থাকে এক গভীর নীরবতা। সেই কবিতার নাম- সুন্দরবন।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে আমরা প্রায়ই দেখি বাঘ, কুমির কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাস হিসেবে। কিন্তু বর্ষার সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়; এটি এক জীবন্ত অনুভূতি। এখানে নদী কথা বলে, বাতাস গান গায়, আর বৃষ্টি শেখায় প্রকৃতিকে নতুন করে ভালোবাসতে।
বর্ষাকালে বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের গভীরে পর্যটকবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকে। অনেকেই মনে করেন, তাই বুঝি বর্ষায় সুন্দরবন ভ্রমণের সুযোগও শেষ। অথচ সত্যটি ঠিক উল্টো। সুন্দরবনের সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে নির্মল এবং সবচেয়ে আবেগঘন অভিজ্ঞতাগুলো বর্ষাতেই অপেক্ষা করে বনঘেঁষা নদী ও জনপদে।
সেই অভিজ্ঞতারই এক অনন্য ঠিকানা- মায়াবন ইকো রিসোর্ট। মোংলা থেকে নৌযান ছেড়ে দেয় ধীরে ধীরে। শহরের শব্দ পেছনে মিলিয়ে যায়। নদীর বাতাসে ভেসে আসে লবণাক্ত জলের গন্ধ। দুই তীরে কেওড়া, গেওয়া, গোলপাতা আর গরান গাছের সবুজ দেয়াল স্বাগত জানায় । দূরে সাদা বকের ঝাঁক উড়ে যায়। মাঝেমধ্যে পানির ওপর ভেঙে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা। নদীর বুকজুড়ে তৈরি হয় হাজারো বৃত্ত । হঠাৎ মাঝি আস্তে বলে ওঠেন- “ওই যে… ডলফিন!” চোখের সামনে নদীর জল ভেদ করে এক মুহূর্তের জন্য ভেসে ওঠে ইরাবতী ডলফিন। আবার মিলিয়ে যায়। এই কয়েক সেকেন্ডই হয়তো পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।
সুন্দরবনে ঢাংমারী নদী ও ঘাগড়ামারী খালের সংযোগ মোহনায়-ইরাবতী ডলফিনের অন্যতম আবাস। এই সংযোগ মোহনার কোল ঘেঁষে পশ্চিম ঢাংমারী অংশে মায়াবন ইকো রিসোর্টের অবস্থান। মায়াবনে পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতিটি হয়, তা হলো- এখানে কোনো কৃত্রিম আয়োজন নেই। নেই উঁচু দালান, কংক্রিটের চাকচিক্য কিংবা শহুরে ব্যস্ততা। আছে কেবল বন, নদী, বাতাস আর মানুষের আন্তরিকতা। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহাবস্থানের দর্শন নিয়েই গড়ে উঠেছে এই ইকো রিসোর্ট। এখানে প্রতিটি গাছ যেন অতিথির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পাখির ডাকও যেন এই রিসোর্টের পরিচয়ের অংশ।
মায়াবনের সকাল শুরু হয় অ্যালার্মে নয়, পাখির ডাকে। চায়ের কাপ হাতে কটেজের বারান্দা থেকে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলেই বোঝা যায়, প্রকৃতির সময় মানুষের সময়ের চেয়ে কত ধীর, কত শান্ত। হাতে চালিত ছোট্ট নৌকায় সরু খাল ধরে এগোতে এগোতে দেখা মেলে মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বক, ঈগল, শামুকখোলসহ অসংখ্য পাখি। খালের দুই পাশে শ্বাসমূল তুলে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন পানির ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছে। নৌকার দাঁড়ের শব্দ ছাড়া চারদিকে আর কোনো শব্দ নেই। এই নীরবতাই সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সংগীত।
মায়াবনের রেস্তোরার দ্বিতীয় তলার পর্যবেক্ষণ ডেকে বসলে বোঝা যায়, কেন মানুষ বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরে আসে সামনে নদী। নদী ও খালের সংযোগস্থল। তার ওপারে সুন্দরবন। জাল বোঝাই জেলেদের ছোট্ট নৌকা জোয়ারের অপেক্ষায় চরে দাঁড়িয়ে আছে। চরে রোদ পোহাচ্ছে একটি কুমির। দূরে হরিণের দল ঘাস খাচ্ছে। গাছের ডালে দুষ্টুমি করছে বানর। আবার কখনো গভীর রাতের নীরবতায় দূর বন থেকে ভেসে আসে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন। শহরের কোলাহলে বসে এসব দৃশ্য কল্পনা করা যায়। কিন্তু অনুভব করা যায় না।
মায়াবনের গল্প শুধু প্রকৃতির নয়। এটি মানুষেরও গল্প । এখানকার অধিকাংশ কর্মী স্থানীয়। যে মানুষগুলো একসময় বন আর নদীর ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, আজ তারাই দায়িত্বশীল পর্যটনের অংশীদার। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় অতিথিদের খাবার। তাঁদের মুখেই শোনা যায় সুন্দরবনের গল্প। তাঁদের সঙ্গেই হাঁটা হয় গ্রামের মেঠোপথ। পর্যটন এখানে শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি প্রান্তিক মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
মায়াবনের খাবারও প্রকৃতির মতোই সহজ, আন্তরিক এবং স্মরণীয়। এখানে প্রতি দিনের খাবারে- চিংড়ি, কাঁকড়া, নদীর টাটকা মাছ, দেশি শাকসবজি, ভর্তা, ভাত, কেওড়ার চাটনি থাকে নিয়মিত দুপুরের তালিকায়। হাসের মাংশ, মাছ ফ্রাই, খিচুড়ি, ভাত, রুটি, পায়েস থাকে রাতের বার-বি-কিউর তালিকায়। এছাড়া রুটি, সবজি, ডাল, সুন্দরবনের খাঁটি মধুর, দেশীয় ফল আর চা, কফি থাকে সকালের খাবারের তালিকায় । তবে চাহিদা ও প্রাপ্যতা অনুযায়ী খাবারের তালিকা পরিবর্তন হয়।
সন্ধ্যায় উপভোগ করতে পারেন, লোকজ সংস্কৃতির পালা গান, পুঁথি অথবা শুনতে পারেন বাঘের থাবা থেকে ফিরে আসা বনজীবীর মুখে জীবন্ত গল্প, মাওয়ালীর মুখ মধু সংগ্রহের রোমহর্ষক আভিজ্ঞতা। রিসোর্টের ছোট্ট সেলস কর্নারে পাওয়া যায় স্থানীয় নারীদের তৈরি হস্তশিল্প, সুন্দরবনের মধু এবং বিভিন্ন গ্রামীণ পণ্য।
স্মৃতিস্বরূপ একটি স্থানীয় স্মারক কেনা মানে এখানকার একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। আজকের পৃথিবীতে বিলাসিতা মানে সবসময় পাঁচতারকা হোটেল নয়। কখনো বিলাসিতা মানে- মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা । একটি বিকেল নদীর দিকে তাকিয়ে কাটানো । বৃষ্টির শব্দ শুনে ঘুমিয়ে পড়া। ভোরে পাখির ডাকে জেগে ওঠা। অথবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে নৌকায় বসে সূর্যাস্ত দেখা। মায়াবন ইকো রিসোর্ট- সেই বিলাসিতারই নাম।
যদি মনে হয় শহরের কোলাহল আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে… যদি মনে হয় কংক্রিটের দেয়ালের বাইরে আবার সবুজকে ছুঁয়ে দেখতে চান… যদি মনে হয় প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্কটা নতুন করে খুঁজে নিতে হবে… তাহলে এই বর্ষায় সুন্দরবনের দোরগোড়ায় চলে যান । হয়তো বাঘের দেখা পাবেন না । কিন্তু তারও চেয়ে মূল্যবান কিছু পাবেন- নিজের সঙ্গে নিজের দেখা।
লোকেশন
মায়াবন ইকো রিসোর্ট
(অরণ্যে অতিথি নিবাস
বাণীশান্তা, পশ্চিম ঢাংমারী, দাকোপ, খুলনা।
যেভাবে যাবেন
মোংলা থেকে রিসোর্টের নিজস্ব নৌযানে প্রায় এক ঘণ্টার নদীপথ।
থাকার ব্যবস্থা
মায়াবন ইকো রিসোর্টে রয়েছে-ডুপ্লেক্স কটেজ, ফ্যামিলি কটেজ, হানিমুন কটেজ, কাপল ও টুইন-বেড রুম। একসঙ্গে প্রায় ৪০ জনের আবাসনের সুবিধা।
প্যাকেজ
২ দিন ১ রাত এবং ৩ দিন ২ রাতের বিভিন্ন প্যাকেজে মোংলা থেকে যাতায়াত, আবাসন, খাবার, নদীভ্রমণ, গ্রাম পরিদর্শন, বার্ড ওয়াচিংসহ নানা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত। গ্রুপে পর্যটক সংখ্যা অনুযায়ী জনপ্রতি প্যাকেজ মূল্য প্রায় ৫,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা।
মনে রাখবেন
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের একটি বন নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ, আমাদের জলবায়ু, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য উত্তরাধিকার। তাই সুন্দরবনে ভ্রমণ হোক দায়িত্বশীল, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক ইতিবাচক অঙ্গীকার । এই বর্ষায় সুন্দরবনের গভীরে নয়, তার হৃদস্পন্দনের কাছে যান। কারণ কখনো কখনো প্রকৃতিকে সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করা যায় তার দোরগোড়াতেই।
যোগাযোগ
রিসোর্ট: মায়াবন ইকো রিসোর্ট, পশ্চিম ঢাংমারি, বাণীশান্তা, দাকোপ, খুলনা ।
মোবাইল: ০১৭৬০305864
ঢাকা অফিস: রিভার এন্ড গ্রীন ট্যুরস, হাউস- ধানমন্ডি,৯৭/১, শুক্রাবাদ বাজার রোড, শুক্রাবাদ, ঢাকা।
মোবাইল: 01979224593;
যশোর অফিস: নাজিমা টাওয়ার, নীচ তলা, এম
এম আলী রোড, মাইক পোর্টিং;
মোবাইল: ০১৩৫২৯৮২৯২৭;
ওয়েবঃ www.mayabonecoresort.com












