লেখক: ড. মোঃ ওয়াসিউল ইসলাম
সুন্দরবনকে ঘিরে সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় গড়ে ওঠা ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ এবং স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় চারটি রিসোর্ট রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান “পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা” বা ECA-তে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হচ্ছিল এবং নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য ও অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুরক্ষার স্বার্থে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান কার্যকর করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্ন করতে হবেঃ যদি এসব রিসোর্ট সত্যিই আইন ও পরিবেশগত বিধিবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে এতগুলো রিসোর্ট এতদিনে তৈরি হলো কীভাবে? এগুলো নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায় ছিল? এবং প্রায় এক দশক ধরে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে ওঠার পর এভাবে ২৪টি স্থাপনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন তৈরি হবে, তার দায়িত্ব কে নেবে?
এটি শুধু ২৪টি রিসোর্টের প্রশ্ন নয়
সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় রিসোর্ট ব্যবসা একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ঘেঁষা এলাকায় বাণিজ্যিক রিসোর্ট নির্মাণ শুরু হয়েছিল আরও আগে এবং গত কয়েক বছরে এর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সমকালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তখনকার হিসাবে ২১টি রিসোর্ট ও কটেজ এবং আরও ১০টি নির্মাণাধীন বা নির্মাণ প্রক্রিয়ায় থাকার কথা উঠে আসে। একই প্রতিবেদনে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।
আমি মনে করি, এখানে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। সুন্দরবনের চারপাশের ECA-তে পর্যটন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রবণতা ২০১৫ সালের দিক থেকেই দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সে সময় থেকে এ এলাকায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের কটেজ, রিসোর্ট ও পর্যটনসেবা গড়ে উঠেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট, সমন্বিত ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (Regulatory framework) দৃশ্যমান হয়নি। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়ঃ নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে এতদিন যদি শৈথিল্য থেকে থাকে, তাহলে সেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় শুধু বর্তমান রিসোর্ট মালিকদের ওপর বর্তাবে কি? আমার মতে, আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ ঘাটতি (Regulatory gap)-ও উপেক্ষা করা যায় না।
ECA ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ও সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। সুন্দরবনের নদীর পাশে অবস্থিত পর্যটন সেবা প্রদানকারী এই ২৪টি স্থাপনাই কী শুধু ECA-র জন্য হুমকির কারণ? ECA-র সীমানায় (১০ কিমি এলাকা) অবস্থিত অন্যান্য স্থাপনা ও কর্মযজ্ঞগুলো কী আপনারা একই ভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন? সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে আসা শত শত মালবাহী জাহাজ ও নৌকাগুলো কী পরিবেশ মানদন্ডগুলো মেনে চলছে? গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কারী কর্মকাণ্ডগুলো কী শুধুমাত্র এই ২৪টি কটেজেই হচ্ছে? এমন অনেক প্রশ্ন কিন্তু এখন আপনাদের কাছে আসবে। আমরা চাই আইনের শাসন দেশের সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হোক।
এখানে উল্লেখ্য, এ সমস্ত কটেজ/রিসোর্টে নিয়মিত ভাবে ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে সমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণি ও পেশা, বিদেশি পর্যটক, এমনকি বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পদচারনা আছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি উচ্চ মহলও স্থানগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করেছেন ও এ শিল্পের উন্নয়নের জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছিলেন।
“অনুমোদনহীন” আর “পরিবেশগতভাবে ক্ষতিকর” এক কথা নয়
এই আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা প্রয়োজন। কোনো রিসোর্ট প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র বা অনুমোদন না পেলে সেটি আইনগত অননুমোদনের (Regulatory non-compliance) বিষয়। কিন্তু কোনো রিসোর্টের প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব কতটা, সেটি একটি পৃথক পরিবেশগত প্রভাবের (Environmental impact) প্রশ্ন। আবার উল্টো দিকটিও সত্য। অনুমোদন থাকলেই কোনো স্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না।
অতএব, “অনুমোদন নেই, তাই অবশ্যই পরিবেশ ধ্বংস করছে” এবং “রিসোর্ট বনের বাইরে, তাই পরিবেশের কোনো ক্ষতি করছে না” এই দুই ধরনের সরলীকরণই পরিহার করা প্রয়োজন। কারণ সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের (Ecosystem) ওপর প্রভাব শুধু বনের সীমানার ভেতরে কোনো স্থাপনা আছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে না। আলো, শব্দ, বর্জ্য, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জলাভূমি, নৌযান চলাচল, পর্যটকের সংখ্যা, নদী ও খালের ব্যবহার এবং মানুষের চলাচলও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও গবেষণায় এসব পরিবেশগত চাপের বিষয় উঠে এসেছে। তাই প্রয়োজন প্রমান-ভিত্তিক পরিবেশগত (Evidence-based environmental assessment), শুধু প্রশাসনিক পরিচিতি বা ব্যবস্থা নয়।
হঠাৎ উচ্ছেদ নতুন সংকট তৈরি করতে পারে
২৪টি রিসোর্ট বন্ধের সিদ্ধান্তের আরেকটি দিকও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার। এসব স্থাপনায় শুধু মালিকের বিনিয়োগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় কর্মসংস্থান, পরিবহন, নৌযান, খাবার সরবরাহ, কৃষিপণ্য ও স্থানীয় পণ্যের বাজার, পর্যটন গাইড, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা।
রিসোর্ট মালিকদের সংগঠন ইতোমধ্যে সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে এবং তাদের বক্তব্য হলো, এসব রিসোর্ট সুন্দরবনের ভেতরে নয়, সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। তাদের দাবি, এসব উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন (Community-based tourism)-এর সঙ্গে যুক্ত।
এই বক্তব্যের সবটুকু গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে আমাদের তথ্য দিয়ে যাচাই করতে হবে। কারণ সুন্দরবন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং সুন্দরবনের সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম শর্ত হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থকে সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা।
আমি আগেও বলেছি, রিসোর্টগুলোর নেতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি এর ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এসব রিসোর্টের মাধ্যমে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিও বড় হতে পারে। তবে সুন্দরবনের ওপর এসব রিসোর্টের সামগ্রিক প্রভাব নিরূপণে আরও গবেষণা ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
ECA-তে উন্নয়ন হবে কি হবে না, প্রশ্নটি এত সরল নয়
পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার উদ্দেশ্য উন্নয়নকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা নয়; বরং এমন উন্নয়নকে নিয়ন্ত্রণ করা, যা সংশ্লিষ্ট বাস্তুত্নত্রের অখন্ডতা (Ecological integrity) নষ্ট করতে পারে। তাই আমাদের এখন “রিসোর্ট থাকবে না থাকবে”- এই দ্বিমাত্রিক বিতর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিতঃ কোথায় রিসোর্ট করা যাবে? কতটি করা যাবে? কী ধরনের স্থাপনা (রিসোর্ট ছাড়াও অন্যান্য স্থাপনা ) করা যাবে? সেখানে কতজন পর্যটক নেওয়া যাবে? কী ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে? কতটুকু পানি ব্যবহার করা যাবে? শব্দ ও আলোর সীমা কী হবে? স্থানীয় জনগণ কতটা অংশীদার হবে? এবং পরিবেশগত কর্মদক্ষতা কীভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে? অর্থাৎ প্রয়োজন জোনিং, ধারণ ক্ষমতা, পরিবেশগত অনুমোদন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক তদারকি।
নীতিতেই যদি পর্যটন উন্নয়নের কথা থাকে, তাহলে এতদিন নিয়ন্ত্রণ কোথায় ছিল?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় আমাদের স্মরণ করা দরকার। জাতীয় পর্যটন নীতিমালা, ২০১০- এ সুন্দরবন ও দেশের অন্যান্য প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাতে পরিকল্পিতভাবে ইকোট্যুরিজম উন্নয়নের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। নীতিমালায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকোট্যুরিজমের জন্য বিভিন্ন সুবিধা সৃষ্টি এবং দেশের অন্যান্য ECA-তেও ইকোট্যুরিজম উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে; একই সঙ্গে এ উন্নয়নকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় পর্যটন সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে করার নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে সুন্দরবন সংলগ্ন ECA-তে পর্যটন সম্ভাবনাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই একেবারে অস্বীকার করা হয়নি; বরং পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে উন্নয়নের ধারণাই নীতিতে স্বীকৃত ছিল।
পাশাপাশি, সুন্দরবন পর্যটন ব্যবস্থাপনার সরকারি নীতিতেও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পর্যটক ধারণক্ষমতা সীমিত রাখা এবং সুন্দরবননির্ভর জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। তাহলে ২০১৫ সাল থেকে ECA-তে পর্যটন অবকাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আগেভাগে সুস্পষ্ট নির্দেশনা, নজরদারি ও সংশোধিত কর্মকান্ড (Corrective action) কেন দৃশ্যমান হলো না? আজ হঠাৎ ২৪টি রিসোর্ট বন্ধের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি গত এক দশকের এই নিয়ন্ত্রন, পরিবেশগত সুশাসন (Governance) এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার (Regulatory and institutional gap) জবাবদিহি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ পর্যটন অঞ্চল আইন, ২০১০ ও পর্যটন উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ের কথা বলে এবং পর্যটন এলাকায় অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়নের পাশাপাশি আইনানুগ বিধিনিষেধের সুযোগ রাখে। সমস্যাটি শুধু পর্যটন উন্নয়ন বনাম পরিবেশ সংরক্ষণ নয়; আসল সমস্যা হলো পরিকল্পনা, জোনিং, অনুমোদন, তদারকি, এবং আন্তঃমন্ত্রনালয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকা।
“ইকো” নাম দিলেই ইকোট্যুরিজম হয় না
বর্তমানে অনেক স্থাপনার নামের সঙ্গে “ইকো-রিসোর্ট”, “ইকো-কটেজ” বা “কমিউনিটি-ভিত্তিক” শব্দ যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু নামের সঙ্গে “ইকো” যুক্ত করলেই কোনো স্থাপনা ইকোট্যুরিজম হয়ে যায় না। সত্যিকারের ইকোট্যুরিজমের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, ন্যায্য উপকার বন্টন, পরিবেশ শিক্ষা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান এবং পর্যটনের পরিবেশগত চাপ (Footprint) কমানোর বিষয় যুক্ত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিভিন্ন গবেষণা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু স্থাপনা নিজেদের “ইকো” বা “কমিউনিটি-ভিত্তিক” হিসেবে পরিচয় দিলেও বাস্তবে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অর্থাৎ এক ধরনের পরিবেশগত প্রতারণা (Greenwashing) হচ্ছে। অতএব, প্রয়োজন শুধু “ইকো-লেভেল”নয়, “ইকো-দক্ষতা” (Eco-performance)।
তাহলে ২৪টি রিসোর্টের ক্ষেত্রে করণীয় কী?
আমার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
প্রথমতঃ আইন প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে – যেসব প্রতিষ্ঠান আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে। পরিবেশগত আইনকে দুর্বল করে কোনোভাবেই পর্যটন উন্নয়ন করা যাবে না। কিন্তু আইন প্রয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, অভিন্ন, ধারাবাহিক, পূর্বানুমানযোগ্য এবং প্রমাণভিত্তিক।
দ্বিতীয়তঃ ২৪টি রিসোর্টের পৃথক পরিবেশগত নিরক্ষণ (Environmental audit) করা যেতে পারে – সব রিসোর্টকে একই শ্রেণিতে না ফেলে প্রতিটির জন্য একটি দ্রুত কিন্তু বৈজ্ঞানিক নিরক্ষণ করা যেতে পারে যেখানে নিম্নের বিষয়াদিকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
- জমির অবস্থান ও ভূমি ব্যবহার অবস্থা
- জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের ওপর প্রভাব
- গাছ প্রাকৃতিক উদ্ভিদরাজির ক্ষতি
- পানি ব্যবহার
- পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- শব্দ ও আলোর মাত্রা
- পর্যটকের সংখ্যা
- স্থানীয় কর্মসংস্থান
- স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ
- সুন্দরবনে পর্যটনচাপ সৃষ্টিতে অবদান
- সমন্বিত পরিবেশগত প্রভাবসহ অন্যান্য উপাদানসমূহ।
এর ভিত্তিতে রিসোর্টগুলোকে বজায় রাখা (Retain), আধুনিকরণ করা (Retrofit), স্থানান্তরিত করা (Relocate) অথবা অপসারণ (Remove)-র বিষয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয়তঃ ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো (Policy framework) করতে হবে – সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি ২৪টি রিসোর্ট বন্ধ করার পর আমরা ধরে নিই যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। বরং আজ যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, আগামীকাল আরও নতুন রিসোর্টের ক্ষেত্রে একই প্রশ্ন উঠবে। তাই প্রয়োজন সুন্দরবন সংলগ্ন পর্যটন এলাকার জন্য একটি সমন্বিত টেকসই পর্যটন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (Integrated Sustainable Tourism Regulatory Framework)।
সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকার জন্য পর্যটক ধারণ ক্ষমতা (Carrying capacity) নির্ধারণ জরুরি
পর্যটন পরিকল্পনায় আমরা অনেক সময় শুধু পর্যটকের সংখ্যা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু পর্যটক ধারণ ক্ষমতা তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত একটি বিষয়। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে অন্তত পাঁচ ধরনের ধারণ ক্ষমতা বিবেচনা করা প্রয়োজনঃ
- Ecological capacity: সুন্দরবনের বাস্তসংস্থান (Ecosystem) কতটা পর্যটন চাপ সহ্য করতে পারে?
- Physical capacity: নির্দিষ্ট স্থানে কতটি স্থাপনা ও কত সংখ্যক পর্যটক ধারণ করা সম্ভব?
- Social capacity: স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটকদের পারস্পরিক সম্পর্ক কতটা চাপমুক্ত রাখা সম্ভব?
- Economic capacity: পর্যটনের আয় কতটা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ন্যায্যভাবে প্রবাহিত হচ্ছে?
- Institutional capacity: সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকরভাবে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে?
এই পাঁচটি বিষয় ছাড়া শুধু রিসোর্ট অনুমোদিত কি না, তা দিয়ে টেকসই পর্যটন নির্ধারণ করা যাবে না।
এখন প্রয়োজন গন্তব্য সুশাসন (Destination governance)
সুন্দরবন ও এর সংলগ্ন পর্যটন ব্যবস্থাপনার অন্যতম দুর্বলতা হলো, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, পর্যটন অবকাঠামো, স্থানীয় জীবিকা, বিনিয়োগ এবং পর্যটকসেবার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে একদিকে যেমন অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে হঠাৎ বন্ধের নির্দেশ বিনিয়োগকারী, কর্মী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
সুন্দরবন একটি প্রশাসনিক সীমারেখায় আবদ্ধ পর্যটন গন্তব্য নয়। এর পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশ বন বিভাগ, পরিবেশ আধিদপ্তর, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, ট্যুরিস্ট পলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ট্যুর অপারেটর, স্থানীয় জনগণ, পর্যটক, এবং ব্যক্তি মালিকাধীন বিনিয়োগকারী বিভিন্নভাবে যুক্ত। তাই বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি সংস্থার পদক্ষেপ দিয়ে কোন একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের পর্যটন সমস্যার বা ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের জন্য প্রয়োজন একটি গন্তব্য ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন কাঠামো (Destination Management and Governance Framework), যেখানে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা স্পষ্ট থাকবে। এই ক্ষেত্রে গন্তব্য ব্যবস্থাপনা সংস্থা (Destination Management Organization বা DMO)-ভিত্তিক কাঠামোও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে DMO কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের (Regulatory authority)-এর বিকল্প হবে না; বরং বিভিন্ন অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়, গন্তব্য পরিকল্পনা, মানদণ্ড (Standard), বিপণন, তদারকি এবং অংশীজন সম্পৃক্ততার একটি সমন্বিত প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।
ইউএসআইডি ইকোট্যুরিজম এক্টিভিটি (USAID Ecotourism Activity) নামক একটি প্রকল্পের (২০২১-২০২৪) মাধ্যমে এই ধারণাটি বাংলাদেশে প্রথমবারের মত সুন্দরবন গন্তব্যের জন্য কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়। এখানে সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, ব্যক্তি-মালিকাধীন বিভিন্ন অংশীজনের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ ইকোট্যুরিজম সোসাইটি (METS) (যা প্রথমে গ্রেটার সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম সোসাইটি বা GSETS নামে পরিচিত ছিল) নামে একটি বৃহত্তর সুন্দরবন ভিত্তিক সমন্বিত গন্তব্য ব্যবস্থাপনা সংস্থা বা একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্থার ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় যার মাধ্যমে পরবর্তীতে প্রকল্পাধীন সময়ে বিভিন্ন রকমের কর্মকাণ্ড যেমনঃ ইকো-গাইড, ট্যুর অপারেটর, ইকো-কটজের গাইড ও মালিকদের প্রশিক্ষণ, পরিবেশ সচেতনতা গঠন, ইত্যাদি সুন্দরবন ও তার সংলগ্ন এলাকায় পরিচালিত হয়। এই প্রকল্পে সরাসরি বেশ কিছু দিন কাজ করার কারণে এ বিষয়ে আমার ভালো একটা অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব হলো, সুন্দরবন পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কিছু রিসোর্ট বা পর্যটন ব্যবসার সমষ্টি হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত গন্তব্য হিসেবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা। DMO গন্তব্য পরিকল্পনা, অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়, সেবার মানদণ্ড, দায়িত্বশীল বিপণন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যটনচর্চা প্রসারে কাজ করতে পারে। তবে DMO পরিবেশ অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর বা অন্য কোনো আইনগত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের বিকল্প নয়; পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান, আইন প্রয়োগ, অনুমোদন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারেই থাকবে। বরং DMO-কে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পরিপূরক একটি সমন্বয় ও জবাবদিহিমূলক সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে সুন্দরবন সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ এবং পর্যটন বিনিয়োগের মধ্যে অধিক কার্যকর ভারসাম্য গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন কারণে (বিশেষতঃ নেতৃত্বের কোন্দল) এই প্রত্যাশিত সংস্থাটি আর বেশী দূর যেতে পারেনি। বর্তমানে সৃষ্ট প্রেক্ষাপট এমন ধরনের গন্তব্য ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রয়োজনীয়তা আমরা বেশ উপলব্ধি করতে পারি। সাম্প্রতিক ২৪টি রিসোর্ট বন্ধের ঘটনাটি দেখিয়েছে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং আগাম পরিকল্পনা, নিয়মিত নজরদারি, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং স্থানীয় অংশীজনের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগকারীদের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না
পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে কোনো অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগকে বৈধতা দেওয়া যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার পর হঠাৎ সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশ দিলে বিনিয়োগকারী, কর্মচারী ও স্থানীয় অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়ে, সেটিও নীতি নির্ধারণীর (Policy consideration) অংশ হওয়া উচিত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হতে পারেঃ Compliance before closure, but conservation before commercial interest অর্থাৎ যেখানে সম্ভব, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করার সুযোগ দিতে হবে; যেখানে আধুনিকরণ করা (Retrofitting) সম্ভব, সেখানে তা করতে হবে; যেখানে স্থানান্তরিত (Relocation) প্রয়োজন, সেখানে Relocation-এর সুযোগ বিবেচনা করতে হবে; আর যেখানে পরিবেশগত ঝুঁকি অপরিবর্তনীয় বা অগ্রহণযোগ্য, সেখানে অপসারণই (Remove) হতে পারে যথাযথ সিদ্ধান্ত। এটি একই সঙ্গে আইনের শাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।
সরকারের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
যদি সুন্দরবনের চারপাশের ECA-তে রিসোর্ট নির্মাণ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে ২০১৫ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে যে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, তার বিষয়ে সময়মতো কেন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Regulatory intervention) করা হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজ ২৪টি রিসোর্টের মালিককে শুধু দায়ী করলে ভবিষ্যতের সমস্যার সমাধান হবে না। বরং আমাদের বুঝতে হবে কোথায় নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতা (Regulatory failure) হয়েছে, কোথায় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়তা (Institutional coordination) ব্যর্থ হয়েছে, কোথায় নীতি শূন্যতা (Policy vacuum) ছিল এবং কোথায় দেখভাল বা তদারকি (Monitoring) দুর্বল ছিল।
এই আত্মসমালোচনা ছাড়া আগামী পাঁচ বা দশ বছর পর আবার নতুন করে একই ধরনের ২৪ বা ৫০টি স্থাপনার বিরুদ্ধে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা, সাজেক, সেন্টমার্টিন, শ্রীমঙ্গল বা অন্য কোন গন্তব্যে অভিযান চালাতে হতে পারে।
সুন্দরবনকে বাঁচাতে পর্যটনকে শত্রু বানানো যাবে না
সুন্দরবনের জন্য পর্যটন একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। কিন্তু পর্যটন যদি সুন্দরবনের পরিবেশগত অখণ্ডতা (Ecological integrity) ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে নিজের ভিত্তিই ধ্বংস করবে। আবার সুন্দরবন সংরক্ষণের নামে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বৈধ অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও বিকল্প জীবিকার পথও বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পর্যটন ব্যবস্থা যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষিত হবে, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবে, বিনিয়োগ দায়িত্বশীল হবে, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে, এবং পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল স্থানীয় পর্যায়ে প্রবাহিত হবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাংলাদেশ বন বিভাগ ২০ বছর মেয়াদী একটি ‘সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম মাস্টার প্লান’ প্রণয়নের কাজ করছে যা বর্তমানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
এছাড়াও সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে ইকোট্যুরিজম একটি আন্যতম উপাদান যেখানে সুন্দরবন ও এর সংলগ্ন এলাকার পর্যটন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য আগামী ১০ বছেরের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশমালা অনুমোদন ও বাস্তবায়নে প্রয়োজন আন্তঃমন্ত্রনালয় ও বিভিন্ন অংশীজনের সমন্বয়, রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ও সর্বপরি পর্যটনের সম্ভাব্যতা বিচারে আমাদের অবস্থান।
এ জন্য ২৪টি রিসোর্ট বন্ধের বর্তমান ঘটনাকে শুধু আইন প্রয়োগের উদ্যোগ (Enforcement drive) হিসেবে না দেখে সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের একটি মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত বা সন্ধিক্ষণ (Turning point) হিসেবে দেখা যেতে পারে। বৃহৎ পরিসরে, শুধু সুন্দরবন নয় বরং বাংলাদেশের অন্যান্য গন্তব্যের পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বা পরিবর্তন হিসাবে দেখা যেতে পারে।
আজকের সিদ্ধান্ত থেকে যদি আমরা শুধু ২৪টি রিসোর্ট বন্ধ করি, তাহলে একটি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন হবে। কিন্তু যদি এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন অঞ্চল বিভাজন, ধারণ ক্ষমতা, পরিবেশগত নিয়ম অনুবর্তিতা, কমিউনিটি সুবিধা বন্টন, ইকো-সার্টিফিকেশন বা পরিবেশগত স্বীকৃতি এবং গন্তব্য শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে এই সংকট একটি নতুন সুযোগে পরিণত হতে পারে।
সুন্দরবনকে ক্ষতি করে পর্যটন নয়; সুন্দরবনকে বাঁচিয়েই পর্যটনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। আর সেই ভবিষ্যতের মূলনীতি হওয়া উচিতঃ “সংরক্ষণ, অনুবর্তিতা ও জনগোষ্ঠীর অংশীদারত্ব” (“Conservation, Compliance and Community”)।
সুন্দরবন সংলগ্ন ২৪টি রিসোর্ট বন্ধের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং প্রয়োজন আইনসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষাকারী পর্যটন ব্যবস্থাপনা। এজন্য শুধু উচ্ছেদ বা বন্ধের নির্দেশ নয়, অতীতের নিয়ন্ত্রণগত ঘাটতির জবাবদিহি, প্রতিটি স্থাপনার স্বচ্ছ পরিবেশগত মূল্যায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ জরুরি। একই সঙ্গে সমন্বিত গন্তব্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও DMO-ভিত্তিক অংশীজন সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেই সংরক্ষণ, স্থানীয় জীবিকা ও দায়িত্বশীল বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ রক্ষার পথ শুধু পর্যটন বন্ধ করা নয়, বরং সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রেখেই পর্যটনের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। বর্তমান সরকার পর্যটন উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপানাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, সুন্দরবন সুরক্ষা ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিবেন যা এ অঞ্চলের পরিবেশ উন্নয়ন ও মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আরও বেশী গ্রহণযোগ্যতা পায়।
ড. মোঃ ওয়াসিউল ইসলাম
অধ্যাপক, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়












