লেখক: আঁখি সিদ্দিকা
সুন্দরবনের ভেতর আর সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রাম এক নয়
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সব পর্যটনকেন্দ্রকে সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অংশ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
বনের এক পাশে গ্রাম, মাঝখানে নদী, আর নদীর ওপারে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সুন্দরবনসংলগ্ন অনেক পর্যটন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে মানুষের বসতিপূর্ণ গ্রামাঞ্চলে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে। সেই জমির মালিকদের মধ্যে কৃষক, জেলে, মৌয়ালসহ স্থানীয় মানুষেরাও রয়েছেন।
অতএব, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সুরক্ষা এবং বনসংলগ্ন মানববসতিতে পর্যটনের ব্যবস্থাপনা, এই দুটি বিষয়কে একই দৃষ্টিতে দেখা যাবে না। দুটির জন্য প্রয়োজন আলাদা বাস্তবতা-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও নীতিমালা।
সুন্দরবন কি শুধু বন, নাকি মানুষসহ একটি জীবন্ত ভূদৃশ্য?
সুন্দরবনকে আমরা সাধারণত একটি বন হিসেবে দেখি। কিন্তু সুন্দরবন কি শুধু বন? নাকি এর সঙ্গে নদী, বন্যপ্রাণী, মানুষের বসতি, জীবিকা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে নিয়ে এটি একটি বৃহত্তর জীবন্ত ভূদৃশ্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনকে শুধু বিনোদন বা ব্যবসার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষে শত বছর ধরে বসবাস করে আসা জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি, কৃষক, নারী, শিশু, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বননির্ভর পরিবারগুলোর জীবনও এই ভূদৃশ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে পর্যটন একই সঙ্গে সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা।
সুন্দরবনকে আমরা ভালোবাসি। সুন্দরবনকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। সুন্দরবনকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু সুন্দরবনকে বাঁচানোর কথা বলতে গিয়ে আমরা অনেক সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে ভুলে যাই। সুন্দরবনকে রক্ষা করার প্রশ্ন তাই শুধু একটি বন রক্ষার প্রশ্ন নয়। এটি একই সঙ্গে একটি প্রতিবেশব্যবস্থা, নদী, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার প্রশ্ন। এই জায়গা থেকেই সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।
প্রশ্নটি শুধু পর্যটন হবে কি হবে না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কোন পর্যটন টেকসই, কোথায় পর্যটন করা যাবে, কী ধরনের অবকাঠামো গ্রহণযোগ্য, কতটা পর্যটন একটি এলাকার পরিবেশ ধারণ করতে পারে এবং কীভাবে স্থানীয় মানুষ এই অর্থনীতির ন্যায্য অংশীদার হবে।
পর্যটন শুধু একটি রিসোর্টের গল্প নয়
সুন্দরবনসংলগ্ন পর্যটনের বিকাশ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব নয়। গোলকানন থেকে শুরু করে ইরাবতী, পিয়ালী এবং পরবর্তী সময়ে জঙ্গলবাড়ি, বনলতা, বনবিবি, সুন্দরী, মায়াবন সহ বিভিন্ন উদ্যোগ এই অঞ্চলে পর্যটনের একটি নতুন অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
প্রত্যেক উদ্যোক্তার স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে। কিন্তু এর পাশাপাশি এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, নৌযান, পরিবহন, কৃষি, মৎস্য, খাদ্য সরবরাহ, সংস্কৃতি ও নানা ধরনের ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও যুক্ত হয়েছে।
এই পর্যটনকেন্দ্রের সঙ্গে বর্তমানে সরাসরি প্রায় ৩০০টি পরিবার যুক্ত আছে। এর বাইরে মাঝি, জেলে, কৃষক, ভ্যানচালক, স্থানীয় গাইড, খাদ্য সরবরাহকারী, কারিগর, সাংস্কৃতিক কর্মী, শ্রমিকসহ পরোক্ষভাবে আরও কয়েক হাজার মানুষের জীবিকার সঙ্গে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হতে পারে। এটাই পর্যটনের একটি বড় শক্তি।
একটি শিল্পকারখানার অর্থনৈতিক সুবিধা প্রধানত তার মালিক ও কর্মীদের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু পর্যটন একটি বিস্তৃত স্থানীয় অর্থনৈতিক শৃঙ্খল তৈরি করতে পারে। একজন পর্যটকের ব্যয় থেকে একই সঙ্গে উপকৃত হতে পারেন নৌকার মাঝি, কৃষক, জেলে, দোকানি, স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী কিংবা হস্তশিল্পীসহ আরও অনেকে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে পর্যটন তাই শুধু ব্যবসা নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় উন্নয়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
মানুষ ও বন সমান্তরালে বাঁচানো
সুন্দরবনসংলগ্ন বহু মানুষের জীবন ঐতিহাসিকভাবে বনের ওপর নির্ভরশীল। কেউ বৈধভাবে মাছ ধরেছেন, মধু সংগ্রহ করেছেন বা বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করেছেন। আবার দারিদ্র্য ও বিকল্প জীবিকার অভাবে কেউ কেউ অবৈধ কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হয়েছেন।
এই বাস্তবতা অস্বীকার করে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন।
মানুষকে বন থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু ভয় দেখানো নয়, বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা।
পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষ যুক্ত হলে সেই বিকল্পের একটি পথ তৈরি হয়। একজন যুবক স্থানীয় গাইড হতে পারেন। একজন নারী রান্না, লন্ড্রি, হস্তশিল্প বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। একজন জেলে নৌকা নিয়ে পর্যটক পরিবহন করতে পারেন। একজন কৃষক স্থানীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহ করতে পারেন। এর ফলে বনের ওপর সরাসরি নির্ভরতার কিছুটা বিকল্প তৈরি হয়। আর এখানেই পর্যটন ও সংরক্ষণের সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ।
যে মানুষ একসময় সুন্দরবনকে শুধু জীবিকার উৎস হিসেবে দেখতেন, তিনি যখন বুঝতে পারেন যে বন বেঁচে থাকলে পর্যটক আসবেন, তাঁর নৌকা চলবে, স্থানীয় পণ্য বিক্রি হবে, তাঁর সন্তান শিক্ষিত হবে, কাজের সুযোগ পাবে, তখন বন রক্ষা তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
স্থানীয় পর্যায়ে গাছ কাটা বন্ধ করা, হরিণের ফাঁদ থেকে সরে আসা, বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা কিংবা বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতন হওয়া তাই শুধু আইন প্রয়োগের ফল হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। বিকল্প জীবিকা ও সামাজিক সচেতনতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষকে সংরক্ষণের বাইরে রেখে সংরক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয় না, মানুষকে সংরক্ষণের অংশীদার করতে হয়।
পর্যটনকে পরিবেশের অংশীদার করতে হবে
অবশ্যই সব পর্যটন উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। শুধু নামের সঙ্গে ‘ইকো’ শব্দটি যুক্ত করলেই কোনো স্থাপনা ইকো-রিসোর্ট হয়ে যায় না। অপরিকল্পিত নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অতিরিক্ত পানি ব্যবহার, শব্দদূষণ কিংবা জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি হলে সেই পর্যটনের পরিবেশগত মূল্যায়ন করতেই হবে। তবে এখানেও প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট কাঠামো।
কোনো উদ্যোগ অনুমোদিত কি না, পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রয়োজন আছে কি না, জমির শ্রেণি কী, স্থাপনাটি কোন এলাকায়, তার পরিবেশগত প্রভাব কতটা, বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা হবে, পর্যটকের সংখ্যা কত হবে, স্থানীয় মানুষের কতটা অংশগ্রহণ থাকবে, এসব বিষয় স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হওয়া দরকার।
অনুমোদন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন স্পষ্ট শর্ত। আর শর্ত ভঙ্গ হলে প্রয়োজন জবাবদিহিতা।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। আগে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত আইন, বিধি বা SOP-এর মাধ্যমে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, সেটি স্পষ্ট হতে হবে। সংশ্লিষ্টদের সেই নিয়ম মানার সুযোগ ও দায়িত্ব দিতে হবে। তারপর কেউ সেই নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ আগে নিয়ম স্পষ্ট, তারপর নিয়মের প্রয়োগ এবং প্রয়োজনে শাস্তি।
সুন্দরবনের ভেতরের পর্যটন নিয়েও একই প্রশ্ন
সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামের পর্যটন নিয়ে যেমন পরিবেশগত প্রশ্ন আছে, তেমনি সুন্দরবনের ভেতরে অনুমোদিত নৌভিত্তিক পর্যটন নিয়েও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। কোর জোনে পর্যটন বহু র্পুব থেকেই অনুমোদিত ও চলমান।
সুন্দরবন নদী ছাড়া দেখা যায় না। তাই নৌযান পর্যটনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই পর্যটকরা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নৌপথে প্রবেশ করেন।
সুতরাং প্রশ্নটি নৌযান চলবে কি না, শুধু সেটি নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত:
কতটি নৌযান চলবে? কতজন পর্যটক একসঙ্গে যেতে পারবেন? কোন রুটে চলবে? কী ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার হবে? কতটা শব্দ করা যাবে? কোথায় নোঙর করা যাবে? বর্জ্য কীভাবে ফেরত আনা হবে? সংবেদনশীল মৌসুমে পর্যটন কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে?
অর্থাৎ অনুমোদিত পর্যটনও হতে হবে দায়িত্বশীল পর্যটন।
নৌযান বন্ধ করে দেওয়া হয়তো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন নৌযান ব্যবস্থার পরিবেশগত সংস্কার, পর্যটকের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট রুট ও গতি, শব্দ ও আলো নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ফেরত আনার বাধ্যবাধকতা, তেল নিঃসরণ প্রতিরোধ এবং ধীরে ধীরে কম-নিঃসরণকারী প্রযুক্তির দিকে যাওয়া। সুন্দরবনের কোর জোন, ইমপ্যাক্টজোন ও সুন্দরবনের মীমাংসিত পর্যটন, বন রক্ষা ও স্থানীয়দের জীবনযাত্রা
সুন্দরবন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রভ বন, যার প্রায় ৬০ শতাংশের মালিকানা বাংলাদেশের। বনটিকে ইউনেসকো ১৯৮৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই বনটির অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক অবদান অপরিসীম। এই বনের দুটি অংশ রয়েছে: কোর জোন ও ইমপ্যাক্ট জোন। কোর জোন হলো বনের প্রাকৃতিক অঞ্চল বা বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। এই অংশকে মানুষের কার্যকলাপ ও অন্যান্য হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষার মাধ্যমে বনকে কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। কোর জোন সরকারিভাবে সংরক্ষিত এলাকা। অন্যদিকে ইমপ্যাক্ট জোন হলো বনের সেই অঞ্চল, যা চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। এই অঞ্চলে মানুষ বাস করে, কৃষিকাজ, অন্যান্য জীবনধর্মী কাজ এবং মানুষের প্রয়োজনে রাস্তাঘাটসহ নানাবিধ ভৌত স্থাপনা তৈরি করে।
বেলজিয়ামের অ্যাগ্রিকনসালটিং ইউরোপ এসএ এবং বাংলাদেশের সদেব কনসাল্ট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড যৌথভাবে ২০১৭-৩৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফরেস্ট্রি মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করেছে। ২৬৯ পাতার এই মাস্টারপ্ল্যানে বনের নানাবিধ সম্পদ ও ইকোসিস্টেম সুরক্ষা প্রস্তাবনার আগে আটটি নীতিমালা, দুটি আইন ও বেশ কিছু রেগুলেশন পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০১০ পর্যালোচনা করা হয়নি। তাই এই মাস্টারপ্ল্যানে পর্যটনকে বন রক্ষা, উন্নয়ন বা উৎকর্ষ সাধনের কোনো উপাদান হিসেবেই উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০১০-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে সুন্দরবন এলাকায় পর্যটন উন্নয়নের কাজ করা যাবে। তবে বনের কোর না ইমপ্যাক্ট কোন অঞ্চলে পর্যটন নিয়ে কাজ করা যাবে, তার কোনো উল্লেখ নেই। বিষয়গুলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে অসমন্বয়ের ফল। অথচ ২০২১ সালে বাংলাদেশ সুন্দরবনের পর্যটন থেকে ৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে বলে বিদেশি সংস্থার রিপোর্ট থেকে জানা যায়।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী ২০১৯ সালে এই বনের চারদিকে ১০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছে। এই অঞ্চলটি সুন্দরবনের ইমপ্যাক্ট জোনও বটে। এখানে বাস করেন কমপক্ষে ১৪ লাখ মানুষ। এই ইমপ্যাক্ট জোনে রয়েছে মানুষের বাড়িঘর, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, রাস্তাঘাট, হাটবাজার, স্কুল-কলেজ, সরকারের নানা দপ্তর এবং স্থানীয় সরকারের বহুমুখী কর্মযজ্ঞ।
এই এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্টসহ নানাবিধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নিয়মিতভাবে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেছে। উল্লেখ্য, বন বিভাগ স্বয়ং কোর জোনে নানারূপ স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এসব অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এবং বনের বাস্তু সংরক্ষণ, বনের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সুন্দরবনের ইমপ্যাক্ট জোনের পর্যটন উন্নয়নের বাস্তবোচিত পদক্ষেপ গ্রহণের আবশ্যিকতা দেখা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ প্রণয়নের জন্য বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সবাই সুন্দরবনের পর্যটন মানেই কোর জোনের পর্যটনকে বুঝি। এর কারণ এখন পর্যন্ত ইমপ্যাক্ট জোনের পর্যটন ব্যবস্থা নিয়ে আমরা কেউই ভাবছি না। কোর জোনে প্রতিদিন মেরিন ভেসেল হিসেবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অর্ধশতাধিক লঞ্চ ও জাহাজ সুন্দরবনের কোর জোনে প্রবেশ করে। সরকারের বন বিভাগ নির্ধারিত ফি গ্রহণের মাধ্যমে এদের প্রবেশাধিকার দেয়।
ফলে বনের পশুপাখির বাসস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও প্রজননব্যবস্থা আশঙ্কাজনকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে সুন্দরবনের ইমপ্যাক্ট জোনের পর্যটন উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এলাকাবাসীর জীবনধারার উৎকর্ষ সাধন, বনের সম্পদ রক্ষা, এলাকাবাসীর বাঞ্ছিত সম্পদের ও সুন্দরবনের বাস্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুন্দরবনের ইমপ্যাক্ট জোনের দাকোপ উপজেলার বানীশান্তা, কৈলাশগঞ্জ ও সুতারখালী- এই তিনটি ইউনিয়ন সুন্দরবনসংলগ্ন অবস্থায় রয়েছে। এখানে বসবাসরত মানুষের কর্মসংস্থান, আয়, বন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য পর্যটন উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। ইসিএ হলেও এখানে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) মানুষের বাস। বেঁচে থাকার অধিকার এবং ইসিএ নিষিদ্ধ কার্যক্রম মাথায় রেখে দাকোপে গড়ে তোলা যায় ‘সমবায়ভিত্তিক কমিউনিটি পর্যটন’ ব্যবস্থা।
সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে হোমস্টে, কমিউনিটি রিসোর্ট, স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, মধু ও মোমজাত পণ্য, হস্তশিল্প, লোকগান, বনবিবির পুঁথি, স্থানীয় ইতিহাস, নদী ও জীববৈচিত্র্যভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম, স্থানীয় গাইডিংসহ নানা ধরনের পর্যটন কার্যক্রম গড়ে উঠতে পারে।
সংস্কৃতিও সংরক্ষণের অংশ
সুন্দরবন শুধু গাছ, নদী আর বন্যপ্রাণীর নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের গান, গল্প, বনবিবির কাহিনি, লোকবিশ্বাস, নৌসংস্কৃতি এবং বহু প্রজন্মের স্থানীয় জীবনযাপন। পর্যটনের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা এসব সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। স্থানীয় সাংস্কৃতিক দল, লোকগান, পটের গান, স্থানীয় ইতিহাস ও মানুষের নিজস্ব জীবনকথা পর্যটনের অংশ হতে পারে। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির মর্যাদা বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে।
এই কাজের মধ্য দিয়ে পর্যটন শুধু দর্শনীয় স্থান দেখানোর ব্যবস্থা থাকবে না, হয়ে উঠবে প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতিকে জানার একটি শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা।
একটি সমন্বিত সরকারি নীতিমালা এখন জরুরি
রিসোর্ট, হোমস্টে, স্থানীয় স্থাপত্যকলা অনুসরণে পর্যটন আবাসন স্থাপন ইত্যাদিসহ আগত পর্যটকদের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, পর্যটন পরিচালনা রীতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এলাকার মানুষের জীবনধারার ওপর পীড়ন রোধের প্রাসঙ্গিক সব বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া বনের জৈব বাস্তুর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বাস্তু সংরক্ষণের বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে স্থানীয় পর্যটন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।
এ অবস্থায় বর্তমানে পরিচালিত সুন্দরবনের কোর জোনে পর্যটনকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোর জোনে কেবল ‘ইকো পর্যটন’ পরিচালনা যেতে পারে এবং এখানে মোট পর্যটকদের সংখ্যা কোনোভাবেই ১০ শতাংশে অতিক্রম করা উচিত নয়। অন্যদিকে বনের ইমপ্যাক্ট জোনকে পর্যটন পরিচালনার স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া উত্তম। এই জোনে ‘ইকো-কালচারাল পর্যটন’ পরিচালনা করা উচিত। ইমপ্যাক্ট জোনে মোট পর্যটকদের ৯০ শতাংশ প্রবেধিকার পেতে পারেন। আমার বিবেচনায় এটিই হতে পারে সুন্দরবনের মীমাংসিত পর্যটনব্যবস্থা।তাই অবিলম্বে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কোর ও ইমপ্যাক্ট জোনের পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
সরকারের বিভিন্ন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি শক্ত সমন্বয় দরকার। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও বিশেষজ্ঞ মত নিয়ে সুন্দরবনে একটি টেকসই পর্যটন উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বন, মানুষ ও পরিবেশ রক্ষার এই আয়োজনকে রাষ্ট্রের সার্বিক মঙ্গল ও মর্যাদার জন্য করতে হবে। এরূপ কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক, নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের নতুন করে পথ দেখাবে। মানুষ, সমাজ ও পরিবেশের সার্বিক রক্ষাকবচ হিসেবেও কাজ করবে সুন্দরবনের এই পর্যটনব্যবস্থা। ইমপ্যাক্ট জোনকে একটি সুস্পষ্ট SOP বা নীতিমালার আওতায় আনা উচিত।
কোথায় পর্যটন অবকাঠামো করা যাবে এবং কোথায় যাবে না;
- কোন ধরনের স্থাপনা গ্রহণযোগ্য;
- পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অন্যান্য অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা;
- বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা;
- পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের মানদণ্ড;
- শব্দ ও আলোকদূষণ নিয়ন্ত্রণ;
- বন্যপ্রাণীর আবাস ও চলাচলের পথ সুরক্ষা;
- পর্যটকের ধারণক্ষমতা বা carrying capacity;
- নৌযানের পরিবেশগত মানদণ্ড;
- স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও লাভের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করা;
- নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ;
- এবং নিয়ম ভঙ্গ হলে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীতিমালা তৈরির সময় স্থানীয় মানুষ, পর্যটন উদ্যোক্তা, পরিবেশবিদ, বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, নৌযান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মতামত নেওয়াও জরুরি। কারণ মাঠের বাস্তবতা না জেনে শুধু কাগজে তৈরি নীতিমালা অনেক সময় কার্যকর হয় না।
সুন্দরবনের সঙ্গে আমার যাত্রা
আমার সুন্দরবনে যাওয়া কোনো পর্যটন ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে নয়। ২০১৫ সালে গবেষণার কাজে প্রথম সুন্দরবনে যাই। সেই যাওয়া ধীরে ধীরে আমার জীবনের একটি দীর্ঘ সম্পর্কের শুরু হয়ে যায়। গবেষণা করতে গিয়ে বুঝতে শুরু করি, সুন্দরবনকে বাইরে থেকে যতটা দেখা যায়, তার ভেতরের জীবন তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
সেখানে নদী আছে, বন আছে, বাঘ আছে। কিন্তু তার সঙ্গে আছে মানুষের ক্ষুধা, ঋণ, দাদন, লবণাক্ততা, দুর্যোগ, কর্মহীনতা, নারীর অসহায়ত্ব এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বননির্ভর জীবন।
আমি দেখেছি, একজন মৌয়াল বন থেকে মধু এনে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দাদনের ঋণ শোধ করতে পারেন না। একজন নারী লবণাক্ত পানিতে পোনা ধরতে গিয়ে নিজের শরীরের ক্ষতি করছেন। একজন যুবকের সামনে কাজ নেই। একটি পরিবার ঋণের টাকা নিয়ে আবার ঋণ শোধ করার জন্য আরেকটি ঋণ নিচ্ছে।
তখন আমার কাছে সুন্দরবন সংরক্ষণের অর্থটা একটু অন্যরকম হয়ে উঠল। শুরু করলাম বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। যেমন সেলাই মেশিন কিনে দেয়া বা তরমুজ চাষের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু বেশি দুর এগোতে পারলাম না তখন মনে হলো সুন্দরবনই একমাত্র তাদের উর্পাজনের পথ তাকে কিভাবে ভিন্নভাবে কাজে লাগানো যায়, সুন্দরবন বাঁচিয়ে। গোলকান হোম স্টে এর মতো আগেই চলছিল, রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল ১০টি উদ্যোগ নিয়েছিলো পূর্বেই, টিকে ছিলো গোলকানন। যুক্ত হলাম গোলকাননের সাথে। শুরু হলো পর্যটনকে আরও বৃহত্তরভাবে কাজের ইচ্ছে ও স্বপ্ন। যুক্ত হলো গ্রামের মানুষ, আরও যুক্ত হলো শহরের কিছু ছোট উদ্যোক্তা। তৈরি হলো ইরাবতী ইকো রিসোর্ট ও রির্সাচ সেন্টার। গবেষনায় হয়তো ভুল ছিলো না, ট্রেড লাইসেন্স এর মাধ্যমে শুরু হলেও পরে চলমান থাকে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদনের চেষ্টা। এর পরে তৈরি পিয়ালী ইকো রিসোর্ট কালচারাল সেন্টার , সুন্দরী ও জঙ্গল বাড়ির মতো বড় উদ্যোগের প্রচেষ্টা।
আমি আসলে ভেবেছিলাম, মানুষ ও একসাথে বনকে বাঁচাতে হবে। আর সেই চেষ্টায় অনেকে এগিয়ে এসেছিলেন ঠিকই কিন্ত হয়তো সুস্পষ্ট SOP বা নীতিমালার অভাবে কিছু ব্যতয় হয়েছে তা শোধরানোর উপায় তো আছে।
সব উদ্যোগের গল্প আসলে একটি বৃহত্তর গল্প
পিয়ালী, ইরাবতী, গোলকানন কিংবা জঙ্গলবাড়ি, বনলতা, বনবিবি, সুন্দরীসহ বিভিন্ন উদ্যোগকে আলাদা আলাদা প্রতিযোগিতার গল্প হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কারণ এই পরিবর্তনের আসল নায়ক শুধু কোনো এক একজন উদ্যোক্তা নন। আসল গল্পটি হলো সেই নারী, যিনি এখন পর্যটকের জন্য রান্না করেন। সেই যুবক, যিনি বন থেকে অবৈধভাবে সম্পদ সংগ্রহের বদলে স্থানীয় গাইড হিসেবে কাজ করেন। সেই মাঝি, যার নৌকা পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। সেই কৃষক, যার উৎপাদিত পণ্য পর্যটকের খাবারের টেবিলে যায়। সেই শিল্পী, যিনি গ্রামের গানকে আবার মানুষের সামনে ফিরিয়ে আনেন। সেই শিশু, যে নিজের গ্রামের বন ও নদীকে নতুন চোখে দেখতে শেখে। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো একসঙ্গে মিলেই বড় একটি অর্থনীতি এবং বড় একটি সংরক্ষণ-চেতনা তৈরি করতে পারে।
শুধু বন্ধ করাই সমাধান, এরপর কী?
কোনো স্থাপনা সত্যিই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোনো আইন ভঙ্গ হলে আইন প্রয়োগ করতেই হবে।
কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের একটি বড় প্রশ্ন করতে হবে:
এরপর কী?
যদি স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না হয়, তাহলে তারা আবার পুরোনো বননির্ভর জীবিকায় ফিরে যেতে পারেন। যদি পর্যটনের জন্য কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকে, তাহলে নতুন করে অনিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ তৈরি হতে পারে। যদি নৌভিত্তিক পর্যটনের পরিবেশগত মানদণ্ড না থাকে, তাহলে কেবল স্থলভিত্তিক পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে না। তাই সমাধান হওয়া উচিত সমন্বিত।
পরিকল্পনা আগে, তারপর অনুমোদন। অনুমোদনের সঙ্গে শর্ত। শর্তের সঙ্গে তদারকি। আর নিয়ম ভঙ্গ হলে জবাবদিহিতা।
সুন্দরবনের স্টেক হোল্ডার কে? বা সুন্দরবনের ভবিষৎ কার?
সুন্দরবনের স্টেক হোল্ডার কে বন বিভাগ, ভবিষ্যৎ শুধু বন বিভাগের ?নয়তো?
শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের নয়। শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয়েরও নয়। সুন্দরবনের স্টেক হোল্ডার ও ভবিষ্যৎ উভয়ই সেই জেলে পরিবারের, সেই মৌয়ালের, সেই কৃষকের, সেই মাঝির, সেই নারী উদ্যোক্তার, সেই স্থানীয় তরুণের এবং সেই শিশুটির, যে আগামী দিনে এই ভূদৃশ্যের উত্তরাধিকারী হবে। বাঘের, পাখির, হরিনের, মাছের, গাছের, জলের, প্রতিটি পোকার , প্রতিটি প্রাণের, প্রতিটি প্রাণীর।
সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে তাই সুন্দরবনের মানুষকেও রক্ষার অংশীদার করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য এমন পর্যটন হওয়া উচিত নয়, যা শুধু পর্যটককে সুন্দরবন দেখাবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন পর্যটন, যা সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখবে, স্থানীয় মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে এবং প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানকে একটি টেকসই উন্নয়নের মডেলে পরিণত করবে।
সুন্দরবনকে শুধু একটি বন হিসেবে দেখলে আমরা তার অর্ধেক গল্প দেখব।
সুন্দরবন একটি বন। একটি নদী। একটি জীববৈচিত্র্য। একটি সংস্কৃতি। একটি অর্থনীতি এবং একটি জনপদ। সেই কারণেই সুন্দরবনকে বাঁচানোর পথও একমাত্রিক হতে পারে না। বন থাকবে, নদী থাকবে, বাঘ থাকবে, হরিণ থাকবে, পাখি থাকবে, মানুষ থাকবে, আর মানুষের স্বপ্নও থাকবে।
সুন্দরবনকে ঘিরে টেকসই পর্যটনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে সেদিন, যেদিন একজন স্থানীয় মানুষ বলবেন: “সুন্দরবনকে রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, কারণ সুন্দরবন বাঁচলে আমরাও বাঁচব।”












