■ পর্যটন বিচিত্রা প্রতিবেদন
ঢাকা বিভাগ শুধু দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রই নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার। মোগল শাসন, জমিদারি যুগ ও উপনিবেশিক সময়ের নানা চিহ্ন ছড়িয়ে আছে এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। ইট, পাথর আর ভগ্নপ্রায় দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে আছে কয়েকশ বছরের ইতিহাস, রাজনীতি, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির গল্প।
ঢাকা বিভাগের চারটি উল্লেখযোগ্য প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন— লালবাগ দুর্গ জাদুঘর (ঢাকা), বালিয়াটি প্রাসাদ জাদুঘর (মানিকগঞ্জ), পানাম নগর (নারায়ণগঞ্জ) ও ইদ্রাকপুর দুর্গ (মুন্সিগঞ্জ)—এই চারটি স্থাপনা ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ইতিহাস বহন করে। কোনোটি মোগল আমলের অসমাপ্ত স্বপ্ন, কোনোটি জমিদারি জাঁকজমকের প্রতীক, কোনোটি বাণিজ্যনগরের স্মৃতি, আবার কোনোটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাক্ষ্য। এই ফিচার প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো ঢাকা বিভাগের এই চার ঐতিহাসিক স্থাপনার ইতিহাস, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য, বর্তমান অবস্থা ও পর্যটন সম্ভাবনা।
লালবাগ দুর্গ জাদুঘর, ঢাকা
লালবাগ দুর্গ জাদুঘর বা লালবাগ জাদুঘর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন লালবাগ দুর্গ কমপ্লেক্সে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। লালবাগ দুর্গের প্রাথমিক নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। এটি মুঘল স্থাপত্য ও ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দুর্গের অভ্যন্তরে স্থাপিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে মুঘল আমলের বিভিন্ন নিদর্শন, অস্ত্র, পোশাক, মুদ্রা, শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়। এখানে স্থাপত্য কাঠামোর মধ্যে পরিবিবির সমাধি, মসজিদ ও শায়েস্তা খাঁর দরবার হলো উল্লেখযোগ্য। বর্তমান জাদুঘরটি শায়েস্তা খাঁর বাসভবন ও দরবার হলকে পুনঃব্যবহার করে গঠিত হয়েছে।
জাদুঘরে মুঘল আমলের হাতে আঁকা চিত্রকর্ম, বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, মুদ্রা ও ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে, যা সে সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। প্রদর্শনীর মধ্যে শায়েস্তা খাঁর ব্যবহৃত কিছু ব্যক্তিগত দ্রব্যও অন্তর্ভুক্ত। জাদুঘরটি লালবাগ দুর্গের দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মামখানা ভবনে অবস্থিত। ১৭ শতকে মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর বাসভবন হিসেবে নির্মিত এই ভবনের নিচতলার তিনটি কক্ষ নিয়ে জাদুঘর গঠিত হয়েছে। এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে মুঘল আমলের রাজকীয় স্নানাগার।
জাদুঘরে মুঘল আমলের বিভিন্ন দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ১৮শ শতকের যুদ্ধসজ্জিত পুতুল সৈনিক, যাদের পরনে লাল আংরাখা, পায়ে নাগরা এবং হাতে ঢাল ও তরবারি রয়েছে। প্রদর্শনীতে লোহার জালের বর্ম, হাতির দাঁতের বাঁটযুক্ত ছোরা এবং ‘গুপ্তি’ নামক একটি অস্ত্র প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও রয়েছে তীর-ধনুক, বর্শা-বল্লম, হাত-কুঠার, তরবারি, গোক্ষুর, ঢাল, উরস্ত্রাণ, ছোরা ও অন্যান্য ক্ষুদ্রাস্ত্র।
একটি চিত্রকর্মে ১৮৪০ সালের লালবাগ দুর্গ ও তার পাশ দিয়ে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা নদীর দৃশ্য দেখা যায়। প্রদর্শনীতে বাহাদুর শাহ জাফর, আজম শাহ ও শায়েস্তা খাঁর প্রতিকৃতি। চীনামাটির পাত্র, ধাতব সুরাহি, বক্ষবর্ম, শিরস্ত্রাণ এবং টাইলস-সজ্জিত মুঘল হাম্মামের অংশবিশেষ এখানে সংরক্ষিত। এছাড়া ১৭শ শতকের হাতে লেখা কোরআন শরিফ ও তাফসির গ্রন্থ, যেখানে সোনালি ও নীল কালি ব্যবহার করে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হয়েছে। পারস্য থেকে আনা বিষপরীক্ষার পাত্রগুলিও উল্লেখযোগ্য, যেগুলোতে বিষক্রিয়া শনাক্ত করা যেত রঙ পরিবর্তনের মাধ্যমে।
বর্তমানে লালবাগ দুর্গ একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে।
যাওয়ার উপায়: লালবাগ দুর্গ ঢাকার মধ্যেই অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত সবচেয়ে সহজ। গুলিস্তান, সদরঘাট বা আজিমপুর থেকে লালবাগগামী বাস থেকে নামতে হবে লালবাগ কেল্লা স্টপেজ। এছাড়া পুরান ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সরাসরি রিকশা বা সিএনজিতে যাওয়া যায়। ব্যক্তিগত গাড়িতে আজিমপুর–লালবাগ রোড ব্যবহার করে সহজেই পৌঁছানো যায়।
বালিয়াটি প্রাসাদ জাদুঘর, মানিকগঞ্জ
বালিয়াটি প্রাসাদ মানিকগঞ্জ জেলার সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পশ্চিমে এবং ঢাকা জেলা সদর থেকে পয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের ১৯ শতকে নির্মিত অন্যতম প্রাসাদ। একে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বা বালিয়াটি প্রাসাদ বলেও ডাকা হয়। মোট সাতটি স্থাপনা নিয়ে এই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। এই বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বা প্রাসাদটির সবগুলো ভবন একসাথে স্থাপিত হয়নি। এই প্রাসাদের অন্তর্গত বিভিন্ন ভবন জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্লকটি যাদুঘর। এই প্রাসাদটি বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত ও পরিচালিত।
“গোবিন্দ রাম সাহা” বালিয়াটি জমিদার পরিবারের গোড়াপত্তন করেন। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি লবণের বণিক ছিলেন। জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকারের মধ্যে “কিশোরীলাল রায় চৌধুরী, রায়বাহাদুর হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী তৎকালীন শিক্ষাখাতে উন্নয়নের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কিশোরিলাল রায় চৌধুরীর পিতা এবং যার নামানুসারে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত, এই প্রাসাদ চত্বরটি প্রায় ১৬,৫৫৪ বর্গমিটার জমির উপর ছড়িয়ে থাকা ৭টি দক্ষিণমুখী দালানের সমাবেশ। এই দালানগুলো খ্রিষ্টীয় মধ্য ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতকের প্রথমভাগের বিভিন্ন সময়ে জমিদার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। সামনের চারটি প্রসাদ ব্যবহৃত হত ব্যবসায়িক কাজে। এই প্রসাদের পেছনের প্রাসাদকে বলা হয় অন্দর মহল যেখানে বসবাস করত তারা।
বালিয়াটি প্রাসাদ বাংলাদেশে ১৯শ শতকে নির্মিত রেনেসাধর্মী স্থাপত্যকৌশলের অন্যতম নিদর্শন। এই বিশাল প্রাসাদটি ২০ একরের চেয়ে বেশি স্থান জুড়ে অবস্থিত। আসলে এই প্রাসাদটি একই রকম দেখতে কিন্তু পাচটি স্বতন্ত্র ব্লকের সমন্বয়ে গঠিত যার সর্ব পূর্বদিকের একটি ব্লক ব্যতীত বাকি চারটি ব্লক এখনো বিদ্যমান। বর্তমানে চারটি ব্লক আছে যার মধ্যে মাঝের দুইটি ব্লক, যার একটি দ্বীতল বিশিষ্ট এবং আরেকটি টানা বারান্দা বিশিষ্ট যা তিনতল বিশিষ্ট।
এই প্রাসাদের চারটি ব্লকের পিছন অংশে চারটি আলাদা আভ্যন্তরীণ ভবন বা অন্দরমহল আছে। উত্তরদিকে কিছুদূরে অবস্থিত পরিত্যক্ত ভবনটি হল বহির্মহল যা কাঠের কারুকার্য সম্পন্ন। এই ভবনে প্রাসাদের চাকর বাকর, গাড়ি রাখার গ্যারেজ, ঘোড়াশাল ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই বিশাল প্রাসাদটির চারপাশ সুউচ্চ দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই প্রাসাদের তিনটি প্রবেশপথ আছে। যার প্রত্যেকটিতে অর্ধবৃত্তাকার খিলান আকৃতির সিংহ খোদাই করা তৌরণ বিদ্যমান।
মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি উনিশ শতকে বাংলাদেশে নির্মিত প্রাসাদসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক গোবিন্দ রাম সাহা। যিনি একজন মহাজন ও ব্যবসায়ী ছিলেন। জমিদার বাড়িটিতে অনেকগুলো স্থাপনা রয়েছে যেগুলো পাচঁটি পৃথক ভাগে বিভক্ত। সর্বমোট আটটি সুবিশাল দ্বিতল ও ত্রিতল স্থাপনা রয়েছে। স্থাপনাগুলো ঘিরে রয়েছে প্রাচীর। প্রাসাদটির দক্ষিণ দিকে প্রবেশদ্বার হিসেবে চারটি সিংহদুয়ার রয়েছে এবং উত্তরে বিশাল আকৃতির পুকুর রয়েছে। দক্ষিণ দিকে অর্থাৎ সম্মুখভাগের ইমারতগুলোতে কোরিনথিয় স্তম্ভের সারি রয়েছে। এছাড়াও স্থাপনাগুলোতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য লক্ষ করা যায়। জমিদার বাড়ির ভেতরে রং মহল নামে খ্যাত ভবনে বর্তমানে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। এখানে জমিদারি আমলের আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, পুরোনো ছবি, দলিল ও নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী প্রদর্শিত হয়। এসব নিদর্শন থেকে তখনকার অভিজাত জীবনযাপন ও সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে যাওয়ার উপায়: বাসে গুলিস্তান অথবা মহাখালী থেকে ২.৫–৩ ঘণ্টার পথ। এরপর মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে সাঁটুরিয়া যাওয়ার লোকাল বাস বা সিএনজি পাওয়া যায়। সেখানে সাঁটুরিয়া বাজার থেকে রিকশায় সরাসরি বালিয়াটি প্রাসাদ পৌঁছানো যায়। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িতেও সেখানে খুব সহজেই যাওয়া যায়।
পানাম নগর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত পানাম নগর মধ্যযুগীয় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। একসময় এটি ছিল ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদারদের আবাসস্থল। পানাম নগরের প্রধান আকর্ষণ হলো রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ প্রাচীন ভবনসমূহ। এই নগরীতে রয়েছে প্রায় ৫০টির বেশি পুরোনো ভবন, যেগুলোর স্থাপত্যে ইউরোপীয়, মোগল ও স্থানীয় রীতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। খিলানযুক্ত দরজা, রঙিন কারুকাজ, লোহার গ্রিল ও অলংকৃত বারান্দা পানাম নগরকে আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে।
পানাম নগর শুধু আবাসিক এলাকা ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যনগর। নৌপথের মাধ্যমে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা কেন্দ্র স্থানান্তরিত হওয়ায় পানাম নগর ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। পানামের টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। বাড়িগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার, উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, উচ্চতা একতলা থেকে তিনতলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সাথে স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়।
প্রতিটি বাড়িই ব্যবহারোপযোগিতা, কারুকাজ, রঙের ব্যবহার, এবং নির্মাণকৌশলের দিক দিয়ে উদ্ভাবনী কুশলতায় ভরপুর। ইটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই-লোহার তৈরি ব্র্যাকেট, ভেন্টিলেটর আর জানালার গ্রিল। মেঝেতে রয়েছে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই খিলান ও ছাদের মধ্যবর্তী স্থানে নীল ও সাদা ছাপ দেখা যায়। এছাড়া বাড়িগুলোতে নকশা ও কাস্ট আয়রনের কাজ নিখুঁত। কাস্ট আয়রনের এই কাজগুলো ইউরোপের কাজের সমতূল্য বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর সাথে আছে সিরামিক টাইলসের রূপায়ণ। প্রতিটি বাড়িই অন্দরবাটি এবং বহির্বাটি -এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বাড়ির চারদিকের ঘেরাটোপের ভিতর আছে উন্মুক্ত উঠান।
পানাম নগরীর পানি সরবাহের জন্য দুপাশে ২টি খাল ও ৫টি পুকুর আছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে কুয়া বা কূপ। নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে করা হয়েছে খালের দিকে ঢালু। প্রতিটি বাড়ি পরস্পর থেকে সম্মানজনক দূরত্বে রয়েছে। নগরীর যাতায়াতের জন্য রয়েছে এর একমাত্র রাস্তা, যা এই নগরীর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে এপাশ-ওপাশ। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর।
এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরোন টাঁকশাল বাড়ি। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে পশ্চিম দিকে রয়েছে গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ। এ মসজিদটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহীর শাসনামলে নির্মিত হয়। মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা দিয়ে একটু দক্ষিণ দিকে গেলে রয়েছে আরো কিছু ইমারত, বারো আউলিয়ার মাজার, হযরত শাহ ইব্রাহিম দানিশ মন্দা ও তার বংশধরদের মাজার, দমদম গ্রামে অবস্থিত দমদমদুর্গ ইত্যাদি।এছাড়াও নগরীর আশেপাশে ছড়িয়ে আছে ঈসা খাঁ ও তার ছেলে মুসা খাঁর প্রমোদ ভবন, ফতেহ শাহের মসজিদ, সোনাকান্দা দুর্গ, পঞ্চপীরের মাজার, কদম রসুল, চিলেকোঠাসহ বহু পুরাতাত্ত্বিক গুরুত্ববহ স্থাপনা।
ঢাকা থেকে যাওয়ার উপায়: বাসে গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে হবে। এরপর নারায়ণগঞ্জ থেকে লোকাল বাসে সোনারগাঁও যেতে হবে। সোনারগাঁও জাদুঘর এলাকা থেকে হেঁটে বা রিকশায় পানাম নগর।
ইদ্রাকপুর দুর্গ, মুন্সিগঞ্জ
ইদ্রাকপুর কেল্লা অথবা ইদ্রাকপুর দুর্গ মুন্সীগঞ্জ জেলার মুন্সীগঞ্জ শহরে অবস্থিত একটি মোঘল স্থাপত্য। সম্ভবত বাংলার সুবাদার ইসলাম ইসলাম খাঁ অথবা মীর জুমলা ষোলশ শতকের দিকে জাহাঙ্গীর নগরকে (বর্তমান ঢাকা) পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যু থেকে রক্ষা করতে কিছু স্থানে তিনটি জল দুর্গ তৈরি করে তার মধ্যে এটি একটি, মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরের ইছামতি নদীর পশ্চিম তীরে ইদ্রাকপুর নামক স্থানে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। দুর্গটি নারায়নগঞ্জের হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গের চেয়ে আয়তনে কিছুটা ছোট। সুড়ঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সাথে এই দুর্গের যোগাযোগ ছিল বলে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। সুউচ্চ প্রাচীরবিশিষ্ট এই দুর্গের প্রত্যেক কোনায় রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী।
দুর্গাভ্যন্তর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপের জন্য প্রাচীরের মধ্যে অসংখ্য চতুষ্কোণাকার ফোঁকর রয়েছে একমাত্র খিলানাকার দরজাটির অবস্থান উত্তর দিকে। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে ৩৩ মিটার ব্যাসের একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। দূর থেকে শত্রুর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় প্রতি দুর্গে এই ব্যবস্থা ছিল। এই মঞ্চকে ঘিরে আর একটি অতিরিক্ত প্রাচীর মূল দেয়ালের সাথে মিলিত হয়েছে। দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সূদৃঢ় করার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল। কেল্লাটির তিন কিলোমিটারের মধ্যেই ইছামতী, ধলেশ্বরী, মেঘনা এবং শীতলক্ষা নদীর অবস্থান। মোঘল স্থাপত্যের একটি অনন্য কীর্তি হিসেবে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ১৯০৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।
মোঘলরা যখন বাংলাদেশে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার প্রচেষ্টা নেয়, তখন দেখতে পায়, বাংলার বার ভুঁইয়া ও প্রতিকূল নদীবেষ্ঠিত জনপদ ছাড়াও তাদের আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হল মগ (আরাকানী), পর্তুগীজ ও ওলন্দাজ জলদস্যু, যারা কিনা মেঘনা নদী দিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে এসে মূল ভূখণ্ডে লুঠতরাজ করতো। মধ্যএশিয়ার নদীবিবর্জিত অঞ্চল থেকে আসা মূলত ঘোড়সওয়ার মুঘলরা অচীরেই বুঝতে পারে, বাংলাদেশে সাম্রাজ্য সুদৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল এদেশের জলপথকে সুরক্ষিত করা। ধারণা করা হয় সুবাদার ইসলাম খান, বাংলায় মুঘল নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং একজন নৌপ্রধান বা মীর-ই-বহর নিয়োগ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তি ১০০ বছরে তিনটি দূর্গ গড়ে ওঠে যার একটি হলো ইদ্রাকপুর দূর্গ (অন্য দু’টি হাজিগঞ্জ দুর্গ ও সোনাকান্দা দূর্গ)।
ইদ্রাকপুর দুর্গ কম পরিচিত হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এটি পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে।
ঢাকা থেকে যাওয়ার উপায়: বাসে গুলিস্তান বা সায়েদাবাদ থেকে মুন্সিগঞ্জ শহরে যেতে হবে। এরপর শহর থেকে রিকশা বা অটোতে ইদ্রাকপুর দুর্গতে যাওয়া যায়।
জাদুঘর ও প্রত্নস্থল পরিদর্শনের সময়সূচী:
শীতকালীন (১ অক্টোবর – ৩১ মার্চ)
মঙ্গলবার থেকে শনিবার: সকাল ৯.০০ টা থেকে বিকাল ৫.০০ টা পর্যন্ত
সোমবার: দুপুর ১.৩০ টা থেকে বিকাল ৫.০০ টা পর্যন্ত (অর্ধ দিবস)
গ্রীষ্মকালীন (১ এপ্রিল – ৩০ সেপ্টেম্বর)
মঙ্গলবার থেকে শনিবার: সকাল ০৯.০০ টা থেকে বিকাল ৬.০০ টা পর্যন্ত
সোমবার: দুপুর ২.৩০ টা থেকে বিকাল ৬.০০ টা পর্যন্ত (অর্ধ দিবস)
বিরতি: দুপুর ১.০০ টা থেকে ১.৩০ টা পর্যন্ত (শুক্রবার দুপুর ১২.৩০ টা থেকে ২.০০ টা পর্যন্ত)
সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার।
লালবাগ দুর্গের অসমাপ্ত ইতিহাস, বালিয়াটি প্রাসাদের জমিদারি ঐশ্বর্য, পানাম নগরের বাণিজ্যিক অতীত ও ইদ্রাকপুর দুর্গের সামরিক গুরুত্ব—এই চারটি নিদর্শন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অতীতের চারটি আলাদা পরিচয় নিয়ে। এগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এগুলো আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। এই প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনগুলোকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু অতীতকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলা।












