■ পর্যটন বিচিত্রা ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ভ্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো পাসপোর্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সরকার পাসপোর্ট ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে ই-পাসপোর্টই একমাত্র চালু ব্যবস্থা, যা আগের এমআরপি পাসপোর্টের তুলনায় বেশি আধুনিক, নিরাপদ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করে। অনলাইন আবেদন, সহজ ডকুমেন্টেশন এবং বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে করা হয়েছে স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত। বিশেষ করে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিল হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ ও দ্রুত হয়েছে।
ই-পাসপোর্টে একটি আধুনিক ইলেকট্রনিক চিপ থাকে, যেখানে আবেদনকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিরাপদ হয় এবং বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন হয়। অনলাইন আবেদন থেকে শুরু করে হাতে পাসপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই আনা হয়েছে স্বচ্ছতা ও গতি। আবেদনকারীদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অনলাইন প্রক্রিয়া এবং পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর।
পাসপোর্টের ধরন
ই-পাসপোর্টের মেয়াদ সাধারণত দুই ধরনের—৫ বছর ও ১০ বছর। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট দেওয়া হয়, আর ১৮ বছর বা তার বেশি বয়স হলে ৫ বা ১০ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট নেওয়ার সুযোগ থাকে। পাসপোর্টে পৃষ্ঠার সংখ্যাও দুই রকম—৪৮ পৃষ্ঠা এবং ৬৪ পৃষ্ঠা। যাদের বিদেশ যাওয়া বেশি, তাদের জন্য ৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট সুবিধাজনক।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
নতুন নিয়মে পাসপোর্ট করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করা হয়। বাবা ও মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যও আবেদন ফর্মে দিতে হয়। আগে যেমন ছবি, কাগজ সত্যায়ন বা চেয়ারম্যান–মেম্বারের সনদ লাগত, নতুন নিয়মে এসবের কোনো প্রয়োজন নেই।
পাসপোর্টের আবেদন
পাসপোর্টের আবেদন এখন সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে করা হয়। www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে আবেদন শুরু করতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন- নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, এনআইডি/জন্মনিবন্ধন নম্বর ইত্যাদি সতর্কতার সঙ্গে পূরণ করতে হবে। ফর্ম পূরণে কোনো ভুল থাকলে ভবিষ্যতে পাসপোর্ট সংশোধনে ভোগান্তি হতে পারে, তাই তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া খুবই জরুরি।
অনলাইন ফর্ম পূরণের পর পাসপোর্ট ফি পরিশোধ করতে হয়। ফি অনলাইনে মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া যায়। সাধারণ, জরুরি ও এক্সপ্রেস—এই তিন ধরনের ডেলিভারি সার্ভিস রয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে ফি ও পাসপোর্ট পাওয়ার সময় নির্ধারিত হয়।
ফি পরিশোধের পর আবেদনকারীকে একটি নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হয়, যেদিন তাকে পাসপোর্ট অফিস বা এনরোলমেন্ট সেন্টারে গিয়ে বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হয়। সেখানে আবেদনকারীর ছবি তোলা হয়, আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়। এই ধাপ শেষ হলেই আবেদন প্রক্রিয়ার মূল অংশ সম্পন্ন হয়।
ফি পরিশোধ ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট : ব্যাংক অথবা অনলাইন
আবেদনের পরের ধাপ হলো পাসপোর্ট ফি পরিশোধ করা। এটি অনলাইনে বা ব্যাংকে এ-চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া যাবে। ফি’র সাথে ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য। সাধারণ ডেলিভারি (২১ কর্মদিবস), জরুরি ডেলিভারি (১০ কর্মদিবস) এবং অতি জরুরি ডেলিভারি (২ কর্মদিবস) এই তিন ধরনের সেবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফি নির্ধারিত আছে। উদাহরণস্বরূপ, ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদের সাধারণ ডেলিভারির জন্য ৪ হাজার ২৫ টাকা এবং অতি জরুরি ডেলিভারির জন্য ৮ হাজার ৬২৫ টাকা ফি ধার্য করা হয়েছে। ফি পরিশোধের পর আবেদনপত্র প্রিন্ট করে বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য পাসপোর্ট অফিসে অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করতে হবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিল
নতুন নিয়মে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক নয়। আগের নিয়মে পাসপোর্ট করতে হলে থানার পুলিশ আবেদনকারীর বাড়িতে গিয়ে যাচাই করত, যা সময়সাপেক্ষ ও অনেক ক্ষেত্রে ঝামেলার কারণ হতো। ই-পাসপোর্ট চালুর পর সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য এই পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন আর থানায় ঘোরাঘুরি বা বাড়িতে পুলিশ আসার অপেক্ষা করতে হয় না।
তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে—যেমন আইনি জটিলতা, আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা নিরাপত্তাজনিত কোনো বিষয় থাকলে—কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে অতিরিক্ত যাচাই করতে পারে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকদের জন্য নিয়মিত পুলিশ ভেরিফিকেশন এখন আর প্রযোজ্য নয়। এই পরিবর্তনের ফলে পাসপোর্ট পাওয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
পাসপোর্ট ডেলিভারি
বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার পর সব তথ্য যাচাই করে পাসপোর্ট প্রিন্ট করা হয়। সাধারণ ডেলিভারিতে সাধারণত ১৫–২১ কর্মদিবস, জরুরি ডেলিভারিতে ৭–১০ কর্মদিবসের মধ্যে এবং এক্সপ্রেস সার্ভিসে আরও কম সময়ে পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়। পাসপোর্ট তৈরি হলে এসএমএসের মাধ্যমে আবেদনকারীকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
সবশেষে নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে দেখা জরুরি। কোনো ভুল থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট অফিসে জানাতে হয়। এভাবেই নতুন নিয়মে, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই, বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট করার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।












