■ পর্যটন বিচিত্রা প্রতিবেদন
রোজার মাস এলেই পুরান ঢাকার অলিগলি যেন এক অন্যরকম প্রাণ ফিরে পায়। বিকেলের শেষ আলো যখন ধীরে ধীরে মুছে যায়, তখন চকবাজার, নাজিরাবাজার কিংবা ইসলামপুরের সরু রাস্তাগুলো ভরে ওঠে মানুষের ভিড়ে। বাতাসে ভেসে আসে গরম তেলে ভাজা বেগুনি, কাবাব আর মশলার গন্ধ। যেন পুরো এলাকা এক বিশাল ইফতার মেলায় পরিণত হয়।
পুরান ঢাকার ইফতার শুধু খাবার নয়, এটি একটি সংস্কৃতি, একটি স্মৃতি, একটি ঐতিহ্য। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে রমজানের বিকেল মানেই জমজমাট ইফতার বাজার। অনেকেই বলেন, পুরান ঢাকার ইফতারের স্বাদ শুধু মুখে নয়, মনে লেগে থাকে।
বিকেল চারটার পর থেকেই চকবাজার এলাকায় মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে শুধু এখানকার ইফতার কিনতে। কেউ আসে পরিবারের জন্য, কেউ বন্ধুদের আড্ডার জন্য, আবার কেউ শুধু স্বাদ নেওয়ার আনন্দে। পুরান ঢাকার ইফতারের স্বাদ নিতে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব বিক্রেতা আবদুল করিম। তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এখানে ইফতার বিক্রি করছেন। তার দোকানের সামনে সাজানো আছে বোরহানি, ছোলা, বেগুনি আর চিকেন কাবাব।
হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘রমজান আসলে মনে হয় নতুন জীবন শুরু হয়। পুরান ঢাকার ইফতার না খেলে রোজাই যেন অসম্পূর্ণ লাগে অনেকের কাছে।’
এখানকার ইফতারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বৈচিত্র্য। সাধারণ ছোলা বা বেগুনির পাশাপাশি পাওয়া যায় এমন অনেক খাবার, যা অন্য কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। যেমন—বড় বাপের পোলায় খায়, শাহী কাবাব, চিকেন রোস্ট, নেহারি, বুটের ডাল আর বিশেষ মশলার হালিম।

এই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ নামের খাবারটি নিয়েও রয়েছে নানা গল্প। ১৫ পদের খাবার আর ১৬ রকম মসলার মিশেলে তৈরি এই ইফতারকে ঘিরে আছে চারশ বছরের কিংবদন্তি। সরেজমিন দেখা যায়, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে এসেছেন এই ইফতার কিনতে। দোকান ও মানভেদে কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই মিশ্র খাবার।
জানা গেছে, ১৬৭৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান চকবাজার এলাকার বাসিন্দাদের জন্য নির্মাণ করেন ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ। পরে ১৭০২ সালে ঢাকার দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে আধুনিক বাজারে রূপান্তর করেন। মসজিদের সামনে একটি কূপকে কেন্দ্র করে চেয়ার-টেবিল বিছিয়ে ইফতারসামগ্রী বিক্রির প্রচলন শুরু হয়। নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, ১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজার জমজমাট হয়ে ওঠে। রোজার সময় এখানে মোগলাই খাবার ও রকমারি ইফতারি বিক্রি হতো। বিশ শতকের প্রথমদিকেও ঢাকায় ইফতারির বাজার বলতে বোঝাত শুধুই চকবাজারকে।
‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর আক্ষরিক অর্থ-ধনী বাবার ছেলে খায়। ধারণা করা হয়, একসময় এতে ব্যবহৃত হতো ব্যয়বহুল উপকরণ, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে ছিল। তাই এই নামের প্রচলন। ছড়ার মাধ্যমে বিক্রি-‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’-এটি আধুনিক মার্কেটিংয়েরও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিক্রেতাদের মতে, ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, মুরগির গিলা-কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, চিড়া, ডাবলি, বুটের ডাল, মিষ্টিকুমড়াসহ ১৫ পদের খাবার আইটেমের সঙ্গে ১৬ ধরনের মসলা মিশিয়ে মোট ৩১ পদের মিশ্রণ তৈরি হয়। বড় গামলায় দুই হাতে মেখে ঠোঙায় ভরে বিক্রি করা হয়।
রেজাউল করিম সুমন নামে এক যুবক বলেন, প্রতিবছর একবার হলেও এখানে ইফতারি কিনতে আসি। দাম বেশি, কিন্তু ঐতিহ্যের টান আছে।
ইফতার বাজারের ভিড়ে দেখা যায় নানা বয়সের মানুষকে। কেউ অফিস শেষে সরাসরি চলে আসেন চকবাজারে, আবার কেউ পরিবার নিয়ে আসেন ইফতার কেনাকাটা করতে। তরুণদের একটি দল দাঁড়িয়ে গরম জিলাপি কিনছিল। তাদের একজন বলল, ‘আমরা প্রতি বছরই এখানে আসি। পুরান ঢাকার ইফতারের স্বাদ আলাদা। এখানে একটা উৎসবের আমেজ আছে।’

বিক্রেতাদের জন্যও এই সময়টি বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। অনেক দোকানদার সকাল থেকেই রান্নার প্রস্তুতি শুরু করেন। বিশাল বড় কড়াইতে তেল গরম হয়, একদিকে মাংসের কাবাব ভাজা হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে হালিম।
একটি দোকানে দেখা গেল বড় একটি ডেগে হালিম রান্না হচ্ছে। দোকানের কর্মচারীরা বড় বড় খুন্তি দিয়ে নেড়ে চলেছেন সেই ঘন মিশ্রণ। দোকান মালিক জানান, প্রতিদিন প্রায় কয়েকশ কেজি হালিম বিক্রি হয় এখানে। পুরান ঢাকার ইফতারের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। অনেকের মতে, মুঘল আমল থেকেই এই অঞ্চলে ইফতার বাজারের প্রচলন শুরু হয়। তখন নবাব ও অভিজাত পরিবারের রান্নার প্রভাব ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঐতিহ্যই আজও বহন করছে পুরান ঢাকার বাজারগুলো।
ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে পুরো এলাকা যেন আরও ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বিক্রেতারা দ্রুত খাবার প্যাকেট করছেন, ক্রেতারা শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত। দোকানের সামনে লম্বা লাইন, আর চারদিকে মানুষের কোলাহল। মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসার ঠিক আগে অনেকেই রাস্তার পাশেই বসে ইফতার শুরু করেন। কেউ খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙেন, কেউ আবার প্রথমেই মুখে দেন গরম বেগুনি বা জিলাপি। সেই মুহূর্তে পুরো এলাকাজুড়ে এক ধরনের প্রশান্তি নেমে আসে।
তবে পুরান ঢাকার ইফতার শুধু স্থানীয় মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসে এই বিখ্যাত খাবারের স্বাদ নিতে। অনেক বিদেশি পর্যটকও রমজান মাসে এখানে এসে ইফতারের বৈচিত্র্য দেখে বিস্মিত হন।

ঢাকার দ্রুত পরিবর্তনশীল নগর জীবনের মাঝেও পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্য যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে। আধুনিক রেস্তোরাঁ বা ফাস্টফুডের ভিড়েও এখানকার ঐতিহ্যবাহী ইফতার এখনো সমান জনপ্রিয়। অনেক পুরনো পরিবার এখনও তাদের পূর্বপুরুষদের রেসিপি ধরে রেখেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই স্বাদ বজায় রাখার চেষ্টা করেন তারা। ফলে পুরান ঢাকার ইফতার যেন হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য আর স্বাদের এক অনন্য মেলবন্ধন।
রাত নামলে ধীরে ধীরে ভিড় কমতে শুরু করে। দোকানিরা দিনের হিসাব মেলান, কেউ আবার পরের দিনের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবতে থাকেন। এইভাবেই প্রতি রমজানে পুরান ঢাকা যেন হয়ে ওঠে এক বিশাল স্বাদের রাজধানী। এখানে ইফতার শুধু খাবার নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের মিলনের এক অনন্য গল্প।












