■ পর্যটন বিচিত্রা প্রতিবেদন
সিলেট বনবিভাগের আওতাধীন জুরী-২ রেঞ্জের বন বিটে মাধবকুন্ড ইকোপার্ক অবস্থিত। প্রকৃতির এমনই এক অনন্য সৃষ্টি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত ‘মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক’। দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই প্রাকৃতিক জলপ্রপাত এবং এর চারপাশের চিরসবুজ বনাঞ্চল বছরের প্রতিটি দিনই ভ্রমণপিয়াসী মানুষকে এক অদ্ভুত মায়ায় কাছে টানে।
প্রকৃতির ক্যানভাসে জলপ্রপাতের সুর
মাধবকুণ্ড ইকোপার্কের মূল আকর্ষণ হলো এর সুবিশাল জলপ্রপাত। প্রায় ১৬২ ফুট উচ্চতা থেকে পাথরের বুক চিরে আছড়ে পড়া জলরাশির অবিরাম কলতান দূর থেকেই পর্যটকদের কানে এসে দোলা দেয়। ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়া পানির জলকণা বাতাসে ভেসে এক শীতল কুয়াশার সৃষ্টি করে, যা ছুঁয়ে যাওয়া মাত্রই ভ্রমণকারীদের দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়। জলপ্রপাতের নিচে তৈরি হওয়া শান্ত জলাধারে পর্যটকদের জলকেলির দৃশ্য এখানে অত্যন্ত সাধারণ।
জীববৈচিত্র্য ও সবুজের সমারোহ
২০০১ সালে এই এলাকাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রায় ২৬৭ একর পাহাড়ী এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি শুধু জলপ্রপাতের জন্যই নয়, বরং এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্যও বিখ্যাত। ইকোপার্কের ভেতরে রয়েছে সারি সারি সেগুন, গর্জন, বাঁশঝাড় এবং বিভিন্ন প্রজাতির ফার্ন ও অর্কিড। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ চা বাগান এবং খাসিয়া পুঞ্জির পানের বরজ পার্কের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভাগ্য ভালো হলে এখানকার ঘন বনে চশমা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মায়াহরিণ কিংবা নানা রঙের বুনো পাখির দেখাও মিলতে পারে।
অ্যাডভেঞ্চার ও ট্র্যাকিংয়ের সুযোগ
যারা একটু রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের জন্য মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক একটি আদর্শ জায়গা। মূল জলপ্রপাতের ঠিক পাশেই রয়েছে ‘পরীকুণ্ড’ নামের আরেকটি ছোট ও শান্ত জলপ্রপাত। মূল ফটক থেকে কুণ্ডের দিকে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে সুন্দর ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ)। তবে যারা পাহাড়ী ট্র্যাকিং পছন্দ করেন, তারা বনের ভেতরের সরু ট্রেইল ধরে খাসিয়া পল্লী ও পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি ঘুরে আসতে পারেন।
পর্যটন সুবিধা ও অবকাঠামো
পর্যটকদের সুবিধার্থে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এবং বন বিভাগ এখানে বেশ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে। পার্কের ভেতরে রয়েছে রেস্টুরেন্ট, ওয়াচ টাওয়ার, বসার জন্য সুদৃশ্য ছাতা ও বেঞ্চ এবং গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা। তবে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং পার্কের ভেতরের প্রাকৃতিক নীরবতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পর্যটকদের আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ট্রেনে বা বাসে করে প্রথমে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া অথবা সরাসরি সিলেট পৌঁছাতে হবে। কুলাউড়া বা বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় মাধবকুণ্ড ইকোপার্কে।
বর্ষার মায়াবী দিনে জলপ্রপাতের পূর্ণ যৌবন দেখতে কিংবা শীতের শান্ত সকালে কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পাহাড়ের রূপ উপভোগ করতে—মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক হতে পারে আপনার আগামী সপ্তাহের সেরা উইকএন্ড ডেস্টিনেশন।












