■ শাহিদ হোসেন শামীম
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। এক নামেই পরিচয় । ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের ইতিহাসও অনেক দীর্ঘ এবং বিচিত্র। বৈচিত্র্য তাঁতের ধরনে, উৎপাদন পদ্ধতির পার্থক্যে, বুনুনিতে এবং ও নকশায় এমনকি আবহাওয়া, আর্দ্রতা এবং গাছের ছায়া থাকা না থাকার ফারাকে। টাঙ্গাইল শাড়ি একটি বিশেষ স্থান, ভূগোল, ইতিহাস এবং কবিতার সঙ্গে জড়িত। টাঙ্গাইল জেলা ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই সময় ঔপনিবেশিক শহর কলকাতায় তার পরিচয় ছিল ‘ঢাকাই শাড়ি’ হিশাবে। ধলেশ্বরী নদীর তীরে বিস্তীর্ণ তাঁত ক্ষেত্র গড়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় তার পরিচয় দাঁড়িয়েছিল ‘পিসিদের গ্রাম’ হিসাবে। সেখানে ঢাকাই শাড়ি পড়ে আর কপালে সিঁদুর দিয়ে যে মেয়েটিকে তিনি দেখেছিলেন তিনি ঠাকুর পরিবারে যাননি বটে, কিন্তু কবির মনে ‘আসা যাওয়া’ করেছেন।
‘ঘরেতে আসেনি সেতো মনে তার
নিত্য আসা যাওয়া
পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর।’
ধলেশ্বরীর তীরে সেই গ্রামগুলোতে তাঁত নিয়ে আমরা দীর্ঘকাল ধরে কাজ করছি। আমাদের কাজ সব ধরনের তাঁত নিয়ে। বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরার যে শাড়িগুলো পৃথিবীর সকল বাঙালির কাছে পরিচিত তার মধ্যে রয়েছে জামদানি এবং টাঙ্গাইলের ভাইটাল তাঁতের শাড়ি – বিশেষ করে নকশি বুটি শাড়ি। বাংলাদেশের সীমান্তের দুইপাড়ের বাঙালি নারী যেভাবে এই দুই ধরনের শাড়িতে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন তা আর কোন শাড়িতেই হয় না । তবে পাবনার শাড়ির তুলনায় এই শাড়ি মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যেই বেশি ব্যবহার হয়, কারণ এই শাড়ি তৈরিতে যে শিল্প কর্ম ও দক্ষতার প্রয়োজন হয় এবং দামি মিহি সুতার ব্যবহার তাতে এর দাম সাধারণ শাড়ির তুলনায় অনেক বেশি হয়।
জামদানির মতো নকশি বুটি শাড়িও টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়ন ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই এলাকায় বসাকরা তাঁতের শাড়ি উৎপাদন ও বিক্রির কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তারা উচ্চ মানের তাঁত শাড়ি উৎপাদন করে ঢাকাসহ সারাদেশের বাজারে টাঙ্গাইল শাড়ির ব্রান্ডে সুতি ও সিল্কের শাড়ি তৈরি করছেন।
পাথরাইল বাজারটিও শত বছর পুরানা। এখানে অনেক মুসলমান জমিদার ছিলেন, তাদের জন্যে মিহি সুতার কাপড় তৈরি হোত এখানেই। তাঁত গ্রামের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেলেই শোনা যায় ভাইটাল তাঁতে মাকুর শব্দ। আবার দেখা যায় রাস্তার ওপরই লম্বা টানা পড়েছে, নানা রংয়ের রঙিন সুতা দিয়ে। বিশটি শাড়ির টানার মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে এই শাড়ির জমিন, পাড় ও আঁচলের রং কি হবে । তাঁতে উঠলে বোঝা যাবে জ্যাকার্ডে বোনা হবে নাকি বুটি হবে, নাকি দুটোই হবে। সাধারণত এই এলাকায় গাছ- পালা বেশি। গ্রামগুলো ছায়ায় ঘন। বলা হয় এলাকায় বেশি গাছ লাগানোর কারণ তাঁতের শাড়ি টানা দেয়ার সময় এবং বানানোর সময় বেশি রোদে যেন নষ্ট না হয়ে যায়। শাড়িতে যে মাড় দেয়া হয়। তা যেন অতি কড়া রোদে না শুকায়। রোদ-ছায়ার মিশ্রণের নিশ্চয়তা এই গাছগুলো দেয়। প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক রেখেই তাঁতের কাজ চলে । তাঁতের সাথে কৃষি, গাছ পালা সংরক্ষণ, গার্হস্থ্য কাজ এবং পারিবারিক শ্রম বিভাগ সব কিছুই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁত একটি গ্রামীণ গার্হস্থ্য শিল্প, এটি কারখানা নয়। ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যাবহার করে তাঁতশিল্পী হওয়া যায় না । হাতের কাজ বা কারিগরি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের শিল্পকলা । তাই কারখানায় হাতে করা ‘নকশি বুটি শাড়ি’ আশা করা যায় না। এটা টাঙ্গাইওলের নিজস্ব জিনিস। তবে আধুনিক কালের কারখানা বসেছে টাঙ্গাইলে । বিশেষত গ্রামে চিত্তরঞ্জন তাঁত আসার পর থেকে। জ্যাকার্ডের ডিজাইন করা শাড়িতে ছেয়ে গেছে বাজার। নকশি বুটির শাড়ির তুলনায় দাম কম এবং রং ও সিন্থেটিক সুতার ব্যবহার করে এক ধরনের “আকর্ষণীয়” শাড়ি বাজারে জায়গা করে নিতে পেরেছে এই জ্যাকার্ড শাড়ি। এই শাড়ি বুনতে হলে তাঁত চালাবার দক্ষতা অর্জন করলেই হয়। জ্যাকার্ডের ডিজাইন করে দেয় অন্য কোন শিল্পী। কিন্তু নকশি বুটি করতে হলে তাঁতিকে নিজেই শিল্পী হতে হয়। তাকে শাড়ি বুনতে গিয়েই মনের ভেতর থেকে সেই কারুকাজ বুনে আসতে হয় । অথচ জ্যাকার্ডের পাঞ্চ কার্ডেই ডিজাইন নির্ধারিত হয়ে যায়। ঠিকমতো মাকু চালাতে পারলেই হয়। জ্যাকার্ড মেশিনটিও বিদেশ থেকে এসেছে, ফরাসি জ্যাকার্ড সাহেবের আবিষ্কার এই মেশিন উপমহাদেশের তাঁতিদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
শাড়িতে নকশি বুটি করা অনেকটা কাগজে ছবি আঁকার মতো, কিংবা তুলনা করা যেতে পারে সুতার এমব্রয়ডারি করার মতো। উবিনীগ ও প্রবর্তনা দীর্ঘদিন তাঁত শিল্পীদের কাজের পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে যে নকশি বুটির তাঁতি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকেই তার নকশার রূপ নির্ধারণ করে। তাঁতি নিজের চোখের সামনে যা দেখেন, সেটাই সুতা দিয়ে শাড়ির জমিনে ফুটিয়ে তোলেন । লতাপাতা, ফুল, পাখি, পোকা- মাকড়, মাছসহ তাঁতি বাড়িতে যা যা দেখা যায় প্রায় সবই শাড়ির জমিনে ফুটিয়ে তোলা হয় অদ্ভুত সুন্দরভাবে। একই ফুল যা গাছে ছিল, শাড়িতে ভিন্ন রূপে ফুটে ওঠে। তার সাথে শাড়ির জমিনের রং ও পাড়ের রংয়ের মিশ্রণ সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। এই নকশি বুটির বিভিন্ন নামও রয়েছে, যেমন প্রকৃতির কিছু নকশার নাম নয়-পাতা বুটি, আট- পাতা, তিন-পাতা বুটি, পদ্ম বুটি, জবা ফুল বুটি, ঢেঁকি শাক বুটি, পান বুটি, গাছ বুটি, লতা বুটি, শাপলা বুটি, সুর্যমুখী বুটি ইত্যাদি। কিছু বুটি আছে যা একেবারে ঘরের জিনিসপত্রের নকশায় করা, যেমন জগ বুটি, কলশি বুটি, লাটিম বুটি, লাঙল বুটি, হুক্কা বুটি, ঝাকা বুটি, ফুলদানি বুটি, বই বুটি, দাড়ি-পাল্লা বুটি, পাখা বুটি, বোতাম বুটি, টিকলী বুটি, ঘুড়ি বুটি, হারিকেন বুটি, বোতল বুটি, বল বুটি, বীণবাঁশী বুটি, চরকা বুটি, ঝাড়বাতি বুটি, বিস্কুট বুটি ইত্যাদি।
ঘরের ভেতরে থাকা বা আশে পাশের পোকা মাকড়ও তাঁতির মনে বুটির নকশা হয়ে ওঠে, যেমন টিকটিকি বুটি, ভোমরা বুটি, প্রজাপতি বুটি, মাছ বুটি, কাকড়া বুটি, তেলা পোকা বুটি, মাছি বুটি, শংখ বুটি ইত্যাদি। ফলের মধ্যে আনারস বুটি, কামরাঙ্গা বুটি, করলা বুটি ইত্যাদি । তাছাড়া চোখ বুটী, তারা বুটি, সূর্য বুটি, ঢেউ বুটি, চমচম বুটি কোন কিছুই তাঁতির দৃষ্টি এড়ায় না। বুটি থেকে খোড তাঁতিকেঈ চেনা যায়। এতো ধরনের বুটি করার অভিজ্ঞতা থাকলেও বাজারের চাহিদার কারণে তাঁত শিল্পীরা অনেক বুটি করেন না।












