■ পর্যটন বিচিত্রা ডেস্ক
বাংলাদেশের নদীমাতৃক সৌন্দর্যকে ঘিরে ভিন্নধর্মী পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ‘ঢাকা ডিনার ক্রুজ’। দেশের নদী পর্যটনের প্রোডাক্ট হিসেবে এটি শুধু একটি নৌভ্রমণ নয়, বরং নদী, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে রিভার অ্যান্ড গ্রিন ট্যুরস এবং গ্রিন হলিডেজ।
নদীর দীর্ঘদিনের পর্যটন অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই এই আয়োজনের সূচনা। ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি ভুলে নদীর শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ করে দিচ্ছে এই ক্রুজ। সন্ধ্যার মায়াবী আলো, ঢেউ, শীতল বাতাস এবং জাহাজের মৃদু দোলসব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে স্বপ্নময় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। ‘ঢাকা ডিনার ক্রুজ’ শুধু রোমান্টিক বা অবকাশ যাপনের আয়োজন নয়; এটি পরিবেশবান্ধব নদীভিত্তিক পর্যটনেরও একটি উদাহরণ। খাবার, সঙ্গীত, নদীর সৌন্দর্য এবং নিরিবিলি পরিবেশ মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় এক অনন্য সন্ধ্যা। একইসঙ্গে নদী সংরক্ষণ ও নদীকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতি সম্পর্কেও সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া হয় পর্যটকদের মাঝে।
কর্পোরেট থেকে পারিবারিক আয়োজনে নদীময় অভিজ্ঞতা
পরবর্তী রিফ্রেশমেন্ট ট্রিপ, বিদায় সংবর্ধনা, পারিবারিক গেট-টুগেদার কিংবা বন্ধুদের বিশেষ আড্ডা- সব আয়োজনই করা যায় নদীর বুকে ভেসে চলা এই বিশেষ ক্রুজে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অতিথিদের জন্য থাকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিক আতিথেয়তা। ফলে আয়োজকদের বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই একটি স্মরণীয় আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
ঢাকা ডিনার ক্রুজে কর্পোরেট অনুষ্ঠান, পারিবারিক আয়োজন কিংবা সামাজিক মিলনমেলাসহ সব ধরনের আয়োজনের সুবিধা রয়েছে। কর্পোরেট আউটিং, বাৎসরিক অনুষ্ঠান, বনভোজন, কনফারেন্স, অনুষ্ঠান – ঢাকা ডিনার ক্রুজের বহরে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন আকারের জাহাজ। ছোট মাঝারি আকারের জাহাজে ২০ থেকে ১০০ জনের জন্য নিয়মিত ক্রুজ পরিচালিত হয়। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী ২০০ থেকে ৫০০ জনের জন্য দিনব্যাপী কর্পোরেট রিভার ক্রুজের আয়োজনও করে প্রতিষ্ঠানটি।
তিন ধরনের বিশেষ ক্রুজ প্যাকেজ
পর্যটকদের জন্য রয়েছে তিনটি আলাদা প্যাকেজ- ডিনার ক্রুজ, ডে লং ক্রুজ এবং রিভার এক্সপিডিশন।
ডিনার ক্রুজ: নদীর বুকে মায়াবী সন্ধ্যা
ডিনার ক্রুজ পরিচালিত হয় প্রতি শুক্রবার, শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত এই আয়োজন চলে। অংশগ্রহণকারীদের বিকেল ৩:৩০ টার মধ্যে শিমুলিয়া নদী ক্রুজ স্টেশনে পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে জাহাজে করে শীতলক্ষ্যা নদীপথে ডেমরার দিকে যাত্রা শুরু হয়। যাত্রার শুরুতেই পরিবেশন করা হয় স্বাগত চা ও কফি।
ক্রুজ চলাকালে নদীর বুকে সূর্যাস্তের দৃশ্য, গোধূলির আলো কিংবা রাতের নীরব নদী- সবকিছুই পর্যটকদের জন্য হয়ে ওঠে অসাধারণ অভিজ্ঞতা। নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা, ফেরি পারাপার শব্দ, পণ্যবাহী জাহাজের এবং শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত নদীপথ ভ্রমণ সব মিলিয়ে এটি এক অন্যরকম অনুভূতি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু হয় এবং ক্রুজেই পরিবেশন করা হয় রাতের খাবার। রাত সাড়ে ৮টায় শিমুলিয়া স্টেশনে ফিরে ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটে।
ডে লং ক্রুজ : নদী, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দিনব্যাপী ভ্রমণ: ডে লং ক্রুজ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিচালিত হয়। রিপোর্টিং টাইম সকাল ৯.৩০ টা। যাত্রা শুরু হয় শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট স্টেশন থেকে, যা কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন এবং চায়না- বাংলাদেশ কনভেনশন সেন্টারের পাশে অবস্থিত। পর্যটকদের নিজ দায়িত্বে শিমুলিয়া স্টেশনে পৌঁছাতে হয়। তবে অতিরিক্ত খরচে পরিবহন সুবিধাও রয়েছে। জাহাজে ওঠার পর অতিথিদের জন্য থাকে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা ও সকালের নাশতা। এরপর শীতলক্ষ্যা নদীপথে ঘোড়াশাল অথবা ডেমরার দিকে ভ্রমণ শুরু হয়।
রূপশী জামদানি পল্লী পরিদর্শন: দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় রূপশী জামদানি পল্লীতে। সেখানে ইউনেস্কো স্বীকৃত জামদানি তৈরির কৌশল কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলা এবং স্মারক হিসেবে জামদানি শাড়ি বা স্কার্ফ কেনার সুযোগও থাকে।
এই আয়োজন স্থানীয় তাঁতশিল্প ও অর্থনীতিকে সহায়তা করে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কেনাকাটার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের আয়ও বৃদ্ধি পায়।
মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি ভ্রমণ
ঐতিহাসিক মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি পরিদর্শন এই ট্যুরের অন্তর্ভুক্ত। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত শতবর্ষী এই জমিদার বাড়িটি ১৮৮৯ সালে বাবু রামরতন ব্যানার্জি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৬২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই স্থাপনায় রয়েছে কারুকার্যমণ্ডিত ৯৫টি কক্ষ, মন্দির, কাছারি ঘর, অতিথিশালা, বৈঠকখানা, আস্তাবল, নাচঘর এবং দুটি বড় পুকুর।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে গেলে ভবনটি কিছু সময় পরিত্যক্ত ছিল। পরে পাকিস্তান সরকার সেখানে কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র ও হাসপাতাল স্থাপন করে। পরবর্তীতে ভবনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে এটি একটি কলেজের পাঠদান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জমিদার বাড়ি দর্শন শেষে বিকেল ৩টায় জাহাজে ফিরে পরিবেশন করা হয় স্ন্যাক্স ও চা-কফিI এরপর বিকেল ৫টায় শিমুলিয়া স্টেশনে ফিরে আসে ক্রুজ।
সুস্বাদু খাবারের আয়োজন
ডে লং ক্রুজের সকালের নাশতায় থাকে পরোটা, মিক্সড সবজি, ডিম, কলা, চা/কফি ও মিনারেল ওয়াটার। লাঞ্চ মেন্যুতে থাকে প্লেইন পোলাও, সাদা ভাত, চিকেন রোস্ট, রুই মাছের ফ্রাই, মিক্সড সবজি, আলু ভর্তা, গাঢ় ডাল, সালাদ, সফট ড্রিংকস, মিষ্টান্ন ও মিনারেল ওয়াটার। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের মেন্যু পরিবর্তন করা যায়।
ভাড়ার বিস্তারিত
১৫-২০ জনের এক্সক্লুসিভ গ্রুপে জনপ্রতি ভাড়া: ৪,০০০ টাকা; ২৫-৩০ জনের এক্সক্লুসিভ গ্রুপে জনপ্রতি ভাড়া: ৩,৫০০ টাকা; ৩৫-৪৫ জনের এক্সক্লুসিভ গ্রুপে জনপ্রতি ভাড়া: ৩,০০০ টাকা; ছুটির দিনের বিশেষ অফারে যৌথ ভ্রমণে জনপ্রতি: ৩,০০০ টাকা।
রিভার এক্সপিডিশন: কাঞ্চন ব্রিজ থেকে পদ্মা ব্ৰিজ দুই দিন এক রাতের বিশেষ এই রিভার এক্সপিডিশন শুরু হয় শীতলক্ষ্যার কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন ঢাকা ডিনার ক্রুজ স্টেশন থেকে এবং শেষ হয় পদ্মা ব্রিজ সংলগ্ন মাওয়া ঘাটে। আবার উল্টো পথেও এই যাত্রা আয়োজন করা হয়।
এই ভ্রমণে পর্যটকরা অতিক্রম করেন পাঁচটি নদী- শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী মোহনা, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা ও পদ্মা। নদীপথে চলতে চলতে দেখা মেলে নদীকেন্দ্ৰিক মানুষের জীবনযাত্রা, বৈচিত্রময় দেশীয় নৌকা, মাছ ধরার নানা কৌশল এবং গ্রামীণ জনপদের সৌন্দর্য। পথিমধ্যে নদীতীরবর্তী গ্রাম, হাট-বাজার কিংবা স্থানীয় শিল্পীদের শিল্পকর্ম পর্যটকদের ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা দেয়। সূর্যোদয়, গোধূলি, জ্যোৎস্না রাত কিংবা বর্ষাকালের উচ্ছ্বসিত নদী; প্রতিটি মুহূর্তে নদী যেন নতুন রূপে ধরা দেয়।
প্যাকেজ মূল্য
২ জন এক কেবিনে থাকলে জনপ্রতি: ১০,০০০ টাকা।
৪ জন এক কেবিনে থাকলে জনপ্রতি: ৮,০০০ টাকা।
ঢাকা-কাঞ্চন ব্রিজ বা ঢাকা-মাওয়া যাতায়াত (প্রয়োজনে): জনপ্রতি ১,৫০০ টাকা।
অতিরিক্ত সুবিধা ও বুকিং নীতিমালা অতিরিক্ত খরচে মাইক্রোবাস, কোস্টার, হাইয়েস কিংবা প্রাইভেট কারের মাধ্যমে পরিবহন সুবিধা প্রদান করা হয়।
নদী ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার এক আয়োজন: ‘ঢাকা ডিনার ক্রুজ’ শুধু বিলাসবহুল নৌভ্রমণ নয়; এটি বাংলাদেশের নদী, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ। নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের বিকাশ, স্থানীয় অর্থনীতির সচলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নদী সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ
মোবাইলঃ ০১৭৩৯৪৫০০৯৯, ০১৯৭০০০4447, 01708427৭৯০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]
ওয়েবসাইট: www.dhakadinnercruise.com
ঢাকা অফিস
৯৭/১, শুক্রাবাদ বাজার
রোড, শুক্রাবাদ, ধানমন্ডি, ঢাকা
ক্রুজ স্টেশন: ঢাকা ডিনার ক্রুজ স্টেশন, শিমুলিয়া বাজার, (কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন পূর্বাচল রাজউক অফিস সংলগ্ন লঞ্চ ঘাট)
উত্তরা অফিস: হাউজ-১, দ্বিতীয় তলা রোড-৩, সেক্টর-১, উত্তরা-১২৩০












