■ পর্যটন বিচিত্রা প্রতিবেদন
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের কথা উঠলে সাধারণত মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর কিংবা ময়নামতির নামই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু উত্তর বাংলার সীমান্তঘেঁষা পঞ্চগড় জেলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক বিস্ময়, যার ইতিহাস এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। সেটি হলো ভিতরগড় দুর্গনগরী।
সবুজ মাঠ, গ্রামীণ জনপদ আর বিস্তীর্ণ সমতলের মাঝে ছড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন দুর্গনগরীকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রত্নস্থল বলে মনে করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, ভিতরগড় শুধু একটি দুর্গ নয়; এটি ছিল একসময়কার পরিকল্পিত নগরসভ্যতা, যেখানে ছিল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বসতি, ধর্মীয় স্থাপনা, জলাধার এবং প্রশাসনিক কাঠামো। আজও এই প্রত্নস্থান পুরোপুরি আবিষ্কৃত হয়নি। মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বহু অজানা ইতিহাস, বহু রহস্য।
কোথায় এই ভিতরগড়?
ভিতরগড় দুর্গনগরী বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে অবস্থিত। পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল। এটি মধ্যযুগের একটি দুর্গ নগরী ছিল। সম্পূর্ণ এলাকার আয়তন ২৫ বর্গ কিলোমিটার। ইতোমধ্যে খননকাজ করে ভিতরগড় দুর্গের অভ্যন্তরে ২২ প্রত্নস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। পাঁচটি গড়ের সমন্বয়ে গঠিত ভিতরগড় একটি গড়। স্থানীয়ভাবে জায়গাটি বহু বছর ধরেই পরিচিত ছিল। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে এর গুরুত্ব সামনে আসে গবেষকদের অনুসন্ধানের পর। বিশাল আয়তনের এই নগরী কয়েকটি স্তরে বিভক্ত এবং পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে মাটির প্রাচীর, পরিখা ও ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন।
ভিতরগড় দুর্গনগরী পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত। দেশের যেকোনো স্থান থেকে পঞ্চগড়ে এসে জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার উত্তরে পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের বোর্ড অফিসে নেমে সেখান থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার পূর্বে গেলেই এগোলেই পৌঁছে যাবে এই দুর্গনগরীতে। এই দুর্গ নগরীটি প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার ব্যাপ্ত এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। পুরো দুর্গটি কয়েকটি স্তরে চারটি আবেষ্টনী দেয়াল দিয়ে বিভক্ত ও এর উত্তর দিকের দেয়াল এবং পূর্ব-পশ্চিম দেয়ালের কিছু অংশ ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় পড়েছে।
১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে বুকানন হ্যামিল্টন ভিতরগড় পরিদর্শন শেষে লিখেছিলেন, “ভিতরগড় নগরীটি চারটি আভ্যন্তরীক গড়ের সমবায়ে গঠিত। গড়গুলির একটি অপরটির অভ্যন্তরভাগে অবস্থিত। রাজার প্রাসাদ অবস্থিত ছিল সবচেয়ে ভিতরের গড়ে। সবচেয়ে ভিতরের এবং মধ্যবর্তী নগরীর উপবিভাগ ছিল। প্রতিটি নগরী সুউচ্চ দুর্গপ্রাচীর ও সুবৃহৎ পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল যার প্রস্থ প্রয় ৫০ ফুট এবং গভীরতা ১০ থেকে ১৫ ফুট। দুর্গের প্রাচীর মাটি ও ইটের মিশ্রণে তৈরি ছিল। দুর্গ নগরীটি কয়েকটি ক্ষুদ্র নগরীতে বিভক্ত ছিল। পূর্ববাহুর সবচেয়ে বাইরের নগরীতে নিম্নবর্গীয় মানুষজন বসবাস করতো এবং স্থানটির নাম ছিরৎল হরিরঘর।
প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন, দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন পৃথু রাজা এবং এটিকে তিনি রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একটি রাজধানীর জন্য যা যা প্রয়োজন সবই ছিল এই রাজধানীতে। আছে বিশাল মহারাজার দিঘী। কথিত আছে রাজধানীতে এক অচ্ছুত জাতের আক্রমণে টিকতে না পেরে এই দিঘীর পানিতে ডুবে সপরিবারে আত্মাহুতি দেন পৃথু রাজা। ইতিহাসবিদদের মতে, ১২৫৭ সালে সুলতান মুঘিসউদ্দীন কামরূপ রাজ্য আক্রমণ করলে এটি সুলতানী শাসনে চলে আসে। ১৪৫৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভিতরগড় অঞ্চলটি কামরূপ রাজ্যের হোসেন শাহ শাসন করেছেন। এ ছাড়াও এ অঞ্চলটি একসময় গৌড় ও প্রাগজ্যোতিষপুরের অংশ ছিল বলে মনে করা হয়। খনন কাজের সময় দুর্গটিতে দুটি প্রাচীন মন্দিরও আবিষ্কৃত হয়।
২০০৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এর অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুসনে জাহানের হাত ধরে শুরু হয় ভিতরগড় প্রত্নস্থলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের কাজ। উল্লেখ্য যে, এটাই পঞ্চগড় জেলার প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন। এরপর থেকে প্রতিবছর শীতকাল ইউল্যাবের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের মাধ্যমে ইতোমধ্যে চারটি বেষ্টনী, এর পরিখাগুলো এবং এই চারটি বেষ্টনীর ভেতরের জায়গাটাতে যেসব স্থাপনা আছে সেগুলো সব চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তার মধ্যে আটটি স্থাপনা খনন করে বের করা হয়েছে। বাকিগুলো খনন না করলেও চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাচীন দূর্গনগরী ভিতরগড়ের রূপরেখা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এটির ইতিহাস ও গবেষণার কাজ শেষের দিকে বলে জানিয়েছেন ড. জাহান।
ইতিহাসের অজানা অধ্যায়: ইতিহাসবিদদের ধারণা, ভিতরগড়ের বয়স প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি হতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি গুপ্ত যুগ কিংবা তারও আগের কোনো সভ্যতার অংশ ছিল। আবার কিছু গবেষকের মতে, কামরূপ রাজ্য বা প্রাচীন উত্তরবঙ্গের কোনো শক্তিশালী শাসকের রাজধানী হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় একটি নগরীর উল্লেখ ইতিহাসের মূলধারার অনেক দলিলে খুব কম পাওয়া যায়।
বিশাল দুর্গপ্রাচীরের বিস্ময়: ভিতরগড়ে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে মাটির তৈরি বিশাল উঁচু প্রাচীর। শত শত বছর ধরে বৃষ্টি, ঝড় আর প্রাকৃতিক ক্ষয়ের পরও এসব প্রাচীর এখনো টিকে আছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, পুরো নগরীটি কয়েক স্তরের দুর্গপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। বাইরের অংশে ছিল গভীর পরিখা, যাতে শত্রুরা সহজে আক্রমণ করতে না পারে। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রমাণ করে, ভিতরগড় একসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নগর ছিল। অনেক জায়গায় এখনো স্পষ্টভাবে প্রাচীন পরিখার চিহ্ন দেখা যায়। বর্ষাকালে এসব এলাকায় পানি জমে ছোট জলাশয়ের মতো রূপ নেয়।
নগর পরিকল্পনার প্রমাণ: ভিতরগড়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নগর পরিকল্পনা। গবেষণায় দেখা গেছে, এখানে সড়ক, বসতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিকল্পিত বিন্যাস ছিল। প্রাচীন বাংলার নগরসভ্যতা সম্পর্কে যেসব ধারণা প্রচলিত রয়েছে, ভিতরগড় সেগুলোকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ এত বড় ও সুসংগঠিত নগরী উত্তরবঙ্গে গড়ে উঠেছিল—এ তথ্যই অনেকের কাছে বিস্ময়কর। এখানে পাওয়া ইটের গঠন, মাটির পাত্র, পোড়ামাটির টুকরা এবং স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধারণা করা হয়, নগরটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও আবিষ্কার: ভিতরগড়ে বিভিন্ন সময়ে সীমিত আকারে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ পরিচালিত হয়েছে। খননে পাওয়া গেছে প্রাচীন ইটের দেয়াল, মৃৎপাত্র, অলংকারের অংশ, পোড়ামাটির নিদর্শন এবং স্থাপনার ভিত্তি। কিছু জায়গায় প্রাচীন জলাধারেরও অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এসব জলাধার শুধু পানি সংরক্ষণের জন্য নয়, বরং নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়।
দুর্গনগরীর বিবরণ: ভিতরগড় দুর্গনগরী মূলত ইটনির্মিত চারটি আবেষ্টনীর সমন্বয়ে গঠিত। বাইরের আবেষ্টনীর ভেতর প্রান্তিক নাগরিক বাস করতেন। ভেতরের আবেষ্টনীতে রাজপ্রাসাদ, দুটি প্রাচীন দিঘি রয়েছে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে একটি ক্রুশাকৃতির মন্দির ও পিরামিড আকৃতির একটি স্তূপও আবিস্কৃত হয়। প্রথম আবেষ্টনী এবং মহারাজার দিঘিসহ পাঁচটি প্রাচীন দিঘিকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে দ্বিতীয় আবেষ্টনী। দেয়ালগুলোর পরিমাপ যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণে ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার, পূর্বে ২ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার এবং পশ্চিমে ৩ কিলোমিটার।
দ্বিতীয় আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে পাঁচটি প্রাচীন দিঘি ছিল। মহারাজার দিঘি, ফুলপুকুরী, কোদালধোয়া, মলানী দিঘি ও সিঙ্গারী দিঘি। এর মধ্যে মহারাজার দিঘি সর্ববৃহৎ, ৫৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। গভীরতা প্রায় ৯ মিটার। তৃতীয় আবেষ্টনীর দেয়ালগুলোর পরিমাপ উত্তরে ২ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার, পূর্বে ৫ দশমিক ২৭ কিলোমিটার, পশ্চিমে ৫ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার এবং দক্ষিণে ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার।
তৃতীয় আবেষ্টনীর উত্তর দেয়ালের পশ্চিমাংশে তালমা নদী। এখানে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহকে পশ্চিম দেয়ালের বাইরে পরিচালনা করা হয়। পাথরঘাটা ও দোমনীতে আরও দুটি পাথরের বাঁধ দুর্গনগরীর মধ্যে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করত।
চতুর্থ আবেষ্টনী দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মিত একটি দুর্গ ধুমগড় নামে পরিচিত। এর দেয়ালগুলোর পরিমাপ পূর্ব ও পশ্চিমে ২১০ মিটার, উত্তরে ৬১০ মিটার এবং দক্ষিণে ৫২০ মিটার। দেয়ালগুলো ১৫ মিটার প্রশস্ত পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত। দুর্গনগরী ভিতরগড় প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যকলার উজ্জ্বল নিদর্শন।
স্থানীয় মানুষের কাছে কিংবদন্তির নগরী
ভিতরগড়কে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা লোককথা প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, এখানে একসময় স্বর্ণভাণ্ডার ছিল। কেউ বলেন, মাটির নিচে এখনো গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। অনেকে আবার এটিকে “হারিয়ে যাওয়া রাজ্য” বলেও উল্লেখ করেন। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা নানা রহস্যময় গল্প শোনান—রাতের বেলা অদ্ভুত শব্দ, মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কিংবা অচেনা স্থাপনার কথা। যদিও এসব গল্পের ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তবুও এগুলো ভিতরগড়কে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা
ভিতরগড় এখনো দেশের বড় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রচারণা থাকলে এটি বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটন গন্তব্য হতে পারে। এখানে পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, গাইড, বিশ্রামাগার ও প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর গড়ে তোলা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়বে। বিশেষ করে যারা ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা নিয়ে আগ্রহী, তাদের জন্য ভিতরগড় হতে পারে অসাধারণ একটি গন্তব্য।
কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে প্রথমে পঞ্চগড় যেতে হবে। ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে পঞ্চগড়গামী বাস চলাচল করে। ট্রেনেও যাওয়া যায়। পঞ্চগড় শহর থেকে স্থানীয় যানবাহনে ভিতরগড় এলাকায় পৌঁছানো যায়। ভ্রমণের জন্য স্থানীয় গাইড সঙ্গে নিলে বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। যারা ইতিহাস ভালোবাসেন, যারা অতীতের রহস্য খুঁজে বেড়ান, তাদের জন্য ভিতরগড় এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে।












