■ পর্যটন বিচিত্রা ডেস্ক
বাংলা নববর্ষ মানেই রঙ, আনন্দ আর ঐতিহ্যের মিলনমেলা। সেই চিরচেনা উৎসব যখন নদীর বুকে ভাসমান এক ঐতিহাসিক স্টিমারে উদযাপিত হয়, তখন তা হয়ে ওঠে আরও ব্যতিক্রমী। গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষ্যে এমনই এক অনন্য আয়োজনের সাক্ষী হয়েছে শতবর্ষী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ, যেখানে দিনভর চলেছে বাঙালিয়ানার উচ্ছ্বাস।
ঢাকার সদরঘাট থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যাত্রা শুরু করে স্টিমারটি। পুরনো দিনের ঐতিহ্যবাহী এই প্যাডেল স্টিমার, যার বড় বড় চাকা পানিতে ঘুরে এগিয়ে চলে—যাত্রীদের ফিরিয়ে নেয় এক নস্টালজিক সময়ের অনুভূতিতে। একসময় নদীপথের রাজা হিসেবে পরিচিত এই স্টিমার আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, আর সেই ঐতিহ্যের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে বৈশাখী উৎসবের রঙ।

স্টিমারটিকে সাজানো হয়েছিল বৈশাখী মোটিফে—বাঘ, সিংহ, ঘুড়ি ও রঙিন নকশায়। এসব সাজসজ্জা শুধু দৃষ্টিনন্দনই ছিল না, বরং বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
যাত্রার শুরুতেই পরিবেশন করা হয় বাঙালিয়ানার মিশেলে সকালের নাস্তা—ফল ও পিঠা। এরপর স্টিমারটি চাঁদপুরের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে তিন নদীর মোহনায় নোঙর করে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্নভোজের। দুপুরের খাবারে ছিল বাঙালির চিরায়ত পছন্দ—ইলিশ ভাজা, পান্তা ভাত, গরম ভাত এবং আলু ভর্তাসহ নানা রকম ভর্তা, ডাল, মাংসসহ নানা রকমের বাঙালিয়ানা খাবার। আর শেষপাতে ছিল দই। নদীর হাওয়ায় বসে এমন আয়োজন যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা আবহকে ফিরিয়ে আনে। নদীর মাঝে বসে এমন খাবার শুধু পেট ভরায় না, বরং মনে গেঁথে দেয় এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

খাবারের পাশাপাশি পুরো যাত্রাজুড়ে চলেছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন শিল্পীরা পরিবেশন করেন বাঙালিয়ানা গানসহ জনপ্রিয় নানা সঙ্গীত। শিল্পীদের এমন পরিবেশনায় স্টিমারের ডেক যেন হয়ে ওঠে এক ভাসমান মঞ্চ। বিকেলের দিকে যাত্রীদের জন্য ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নাস্তা—মোয়া, বাতাসাসহ অন্যান্য পরিচিত খাবার।
এছাড়া ছিল মেহেদি আয়োজন, যেখানে মেয়েদের হাতে আঁকা হয় নানান নকশা। শিশু ও বড়দের জন্য ছিল লুডু, ক্যারাম বোর্ডসহ বিভিন্ন খেলার ব্যবস্থা, যা পুরো পরিবেশকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।

এই ভিন্নধর্মী আয়োজন নিয়ে ভ্রমণকারীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। মোস্তাফিজুর রহমান নামে একজন বলেন, পিএস মাহসুদে ওঠা মানেই শুধু ভ্রমণ না, এটা ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগ। স্টিমারের প্রতিটি অংশেই পুরনো দিনের ছাপ পাওয়া যায়। আর এভাবে নদীর মাঝে বসে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। মনে হয়েছে যেন গ্রামের বাড়িতে বৈশাখ উদযাপন করছি, তবে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে।

এই যাত্রার একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল স্টিমারে অবস্থিত যাদুঘর। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে পুরনো নৌ-যন্ত্রাংশ, স্টিমারের ইতিহাস সম্পর্কিত ছবি ও নানা দলিল।

এজন ভ্রমণকারী বলেন, যাদুঘরটা দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। এত পুরনো একটি স্টিমারের ইতিহাস এত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে—এটা আমাদের ঐতিহ্যকে নতুন করে চিনতে সাহায্য করে। যাদুঘরটি আমাদের দেশের নদীপথের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে।
বিকেল ৬টার দিকে সদরঘাটে ফিরে এসে শেষ হয় এই ভাসমান উৎসবের যাত্রা। কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের মনে রয়ে যায় এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা—যেখানে নদী, ঐতিহ্য আর উৎসব মিলেমিশে তৈরি করেছে স্মরণীয় এক দিন।












