■ পর্যটন বিচিত্রা প্রতিবেদক
বাংলাদেশের প্রকৃতি, নদী, বন, গ্রাম আর মানুষ যেন নতুন করে ধরা দেয় মোস্তাফিজুর রহমানের ছবিতে। কখনও মৌয়ালের কষ্ট, কখনও মাঠে বিশ্বকাপ দেখার উল্লাস, গ্রামীণ মানুষের নির্মল হাসি, আবার কখনও পানির জন্য দীর্ঘ পথ হাঁটা নারীর সংগ্রাম- সবই তার ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রায় তিন দশক ধরে চলা তার আলোকচিত্র যাত্রা এখন বিশ্বমঞ্চে পরিচিত নাম। তার নাম মূলত মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান হলেও তিনি পরিচিত মুস্তাফিজ মামুন নামেই। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তিনি ভ্রমণবিষয়ক লেখালেখি করছেন এই নামেই । অর্জন করেছেন বিশ্বের সম্মানজনক অনেক পুরস্কার। তার তোলা ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে বিশ্বের অনেক দেশে । দীর্ঘ এক আলাপচারিতায় তিনি শোনালেন শৈশবের টান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে তার অনন্য যাত্রার কথা।
প্রশ্ন: আপনার ছবির ভুবনে যাত্রা শুরু কোথা থেকে?
মামুন: সেই ছোটবেলায় বইয়ের মলাট দেওয়ার জন্য বিদেশি ম্যাগাজিন পাওয়া যেত। সেসব ম্যাগাজিনের পাতায় পাতায় ছিল অচেনা দেশের নানা রকম মন মাতানো ছবি । সেসব ছবি আমাকে ভীষণভাবে টানত। তখনই স্বপ্ন জাগে- একদিন আমিও এমন ছবি তুলব।
প্রশ্ন: প্রথমবার ক্যামেরা হাতে পাওয়ার স্মৃতি কেমন?
মামুন: ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় বন্ধু লিপুর বাবার ইয়াশিকা ইলেক্ট্রো ৩৫ ক্যামেরা প্রথম হাতে নিয়েছিলাম। তবে আসল যাত্রা শুরু হয় ক্লাস সেভেনে, যখন চাচির আলমারিতে ধুলো জমে থাকা একটি পেন্টাক্স এমজি-১ ক্যামেররা হাতে পাই।
সেটিকে মেরামত করেই শুরু হয় আমার ছবি তোলা শুরু।
প্রশ্ন: শুরুর দিনগুলোতে তো অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, তাই না?
মামুন: অবশ্যই । তখন দশ টাকায় রিভার ব্র্যান্ডের সাদাকোলো ফিল্ম কিনতে পাওয়া যেত । একটি ফিল্ম কিনতে ১০ টাকা, ডেভেলপ করতে আরও ১০ টাকা । টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে তখন ফিল্ম কিনতাম, ছবি তুলতাম। পরে নিজেই ফিল্ম ডেভেলপ করতে শিখে ফেলি । কষ্ট ছিল অনেক, কিন্তু আনন্দ ছিল আরও বেশি।
প্রশ্ন: কখন মনে হলো, এটাই আপনার পেশা হবে?
মামুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে প্রশিক্ষণ নেই ফটোগ্রাফির। এর পর থেকেই পত্রিকায় কাজও শুরু করি । এর পরে ভর্তি হই বিশ্ব পরিচিত সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট- পাঠশালায় । সেখানে ফটোগ্রাফি নিয়ে নানান প্রশিক্ষণ আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। তখনই ঠিক করি, জীবনটা ছবি নিয়েই কাটাব।
প্রশ্ন: পেশাগত জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতা কি ছিল?
মামুন: ২০১৫ সালে সুন্দরবনে মৌয়ালদের ছবি তুলতে গিয়ে মৌমাছির আক্রমণে মৃত্যুর মুখে পড়েছিলাম। আবার ২০১৩ সালে লাউয়াছড়ায় হনুমানের আক্রমণে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল ২০০০ সাল থেকে ২০২৫ সালে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক ঘটনা, সংঘর্ষ, দুর্ঘটনা সামনে থেকে কাভার করেছি । এসব কষ্ট আজ মনে হয় প্রাপ্তিরই অংশ।
প্রশ্ন: প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেমন অনুভূতি এনে দিয়েছিল?
মামুন: সম্ভবত ২০১৩ সালে রিডার্স ডাইজেস্ট এশিয়ার Unseen Asia পুরস্কার। টাঙ্গাইলের মধুপুরে আনারস বোঝাই সাইকেলের ছবি ছিল সেটি প্রথমবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ছবি জায়গা পাওয়াটা ছিল আনন্দের চূড়ান্ত রূপ। একই সময়ে সাউথ এশিয়ান এসোসিয়েশন অব রিজিওনাল কোঅপারেশন-সার্ক ফটোগ্রাফির প্রথম পুরস্কারসহ আরো দুটি পুরস্কার জিতেছিলাম।
প্রশ্ন: এত পুরস্কারের মধ্যে কোনটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে?
মামুন: ওয়াশিংটন থেকে ২০১৭ Consultative Group to Assist the Poor- CGAP এর গ্রান্ড পুরস্কার। কারণ ছবিটি ছিল সুন্দরবনের মৌয়ালদের নিয়ে। তাদের সংগ্রামকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। এছাড়া Mangrove Photography Award GI সুন্দরবনে মৌয়ালদের ছবি দিয়ে প্রথম পুরস্কার আমাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে। বাংলাদেশকে মুহাররকে আমার যৌথ প্রদর্শনী এবং যুক্তরাজ্যে, ইতালি, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে দলগত প্রদর্শনী করেছি। সেখানে বুঝেছি, ছবি ভাষা বোঝে না, শুধু গল্প বোঝে । আর সেই গল্পই মানুষকে কাছে টানে।
প্রশ্ন: ভ্রমণবিষয়ক ও ছবিকেন্দ্রিক বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মামুন: দেখুন বাংলাদেশ, দেখুন সুন্দরবন, দেখুন সমুদ্র প্রশ্নঃ আপনার ছবির বিষয়বস্তুতে গ্রাম, প্রকৃতি, সৈকত, বনে বেড়াইড় এই চারটি ভ্রমণবিষয়ক বই সুন্দরবন এত জায়গা কেন নেয়? মামুন: আমি বিশ্বাস করি, সত্যিকারভাবে জানতে হলে প্রকৃতি ও মানুষকে জানতে হবে। আমার ক্যামেরা সেই বাংলাদেশকেই তুলে ধরে। তবে আমার ছবির বিষয়বস্তু শুধু গ্রাম, প্রকৃতি, সুন্দরবনই নয়। পুরো বিশ্ব মঞ্চই আমার ছবির বিষয়বস্তু । সারা পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি কিংবা প্রত্নতত্ত্ব সব বিষয়ের ছবিই আমি তুলি।
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?
মামুন: সম্প্রতি নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উপলক্ষে Save the People এর আয়োজনে শেষ হলো আমার একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘ইকোস অব পিস’। এর সহযোগিতায় ছিল United Nation Association of USA – Queens Chapter ২০২৪ সালেও ‘পিসফুল বাংলাদেশ’ শিরোনামে আমার একটি একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল নিউইয়র্কে। এছাড়া ২০২৩ সালে ইতালির মিলানে ‘সেলিব্রেটিং কালারস অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে আমার একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয় ।
মেক্সিকোর রিফর্মা এভিনিউ, কোলিমা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেরেতারোর জাদুঘরে, বাহরাইনের মানামা মূলত তথ্যনির্ভর। এর মধ্যে ‘দেখুন বাংলাদেশ’ হলো বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণের একটি তথ্যবহুল বই। আর বাকি তিনটি বই যথাক্রমে বাংলাদেশের সুন্দরবন, সমুদ্র সৈকত আর বনে বেড়ানোর বই আর Celebrating Colors of Bangladesh ছিল ছবিকেন্দ্রিক, প্রকাশিত হয়েছে ইতালির মিলান থেকে। বই প্রকাশের মাধ্যমে আমি চাই, আমার ক্যামেরার চোখে দেখা বাংলাদেশ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছাক। আমার আরেকটি বই প্রকাশের পথে। ইউএসএ থেকে প্রকাশিতব্য বইটির নাম Divine Archetecture of Bangladesg
প্রশ্ন: তরুণ আলোকচিত্রীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
মামুন: ক্যামেরা নয়, চোখ ও দৃষ্টিভঙ্গি সবচেয়ে বড়। প্রতিদিন ছবি তুলতে হবে, প্রচুর ছবি দেখতে হবে । ধৈর্য আর নিষ্ঠাই তরুণদের এগিয়ে নেবে। পজিটিভ বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হবে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতের জন্য আপনার স্বপ্ন কী?
মামুন: জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছবি তুলে যাওয়া। পৃথিবীর সামনে সুন্দর বাংলাদেশকে তুলে ধরা । আর একদিন পৃথিবীর নানা দেশের ছবি নিয়ে একটি বড় বই প্রকাশ করা।











