বাংলা গানে নদী প্রসঙ্গ

বাংলা গানে নদী প্রসঙ্গ

সতত বহমান বাংলার নদী। নদী বহে নীরবধি। বহমান নদী কখনও শান্ত-স্নিগ্ধ-স্বচ্ছসলিলা আবার কখনও উন্মাত্তা-ভয়ংকরী। বহমান নদীর অজস্র জলধারা প্রতিদিন চলে যাচ্ছে যা আর কোন দিন ফিরবে না। বাংলা গানে কবিতায় নদীর কথা এসেছে বার বার। নদী যেমন আমাদের প্রচুর দেয়-আবার কেড়েও নেয় প্রচুর। প্রমত্তা নদীর রুদ্ররূপ আর ভয়ংকর ধ্বংসলীলা দেখে মরমী কণ্ঠ শিল্পী গেয়েছেনঃ ‘‘

সতত বহমান বাংলার নদী। নদী বহে নীরবধি। বহমান নদী কখনও শান্ত-স্নিগ্ধ-স্বচ্ছসলিলা আবার কখনও উন্মাত্তা-ভয়ংকরী। বহমান নদীর অজস্র জলধারা প্রতিদিন চলে যাচ্ছে যা আর কোন দিন ফিরবে না।

বাংলা গানে কবিতায় নদীর কথা এসেছে বার বার। নদী যেমন আমাদের প্রচুর দেয়-আবার কেড়েও নেয় প্রচুর। প্রমত্তা নদীর রুদ্ররূপ আর ভয়ংকর ধ্বংসলীলা দেখে মরমী কণ্ঠ শিল্পী গেয়েছেনঃ ‘‘ নদীর এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে এইতো নদীর খেলা সকাল বেলা আমির যে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা……..।’’(কবি নজরুল ইসলাম) পরলৌকিক মুক্তিলাভের আসায় মরমী কণ্ঠ শিল্পীরা গেয়েছেনঃ ‘তোমার নাম লইয়া ধরিলাম পাড়ি, অকূল দরিয়ায়, সাঁই, সাইরে…..। মাঝি বাইয়া যাওরে……অকূল দরিয়ার মাঝে, আমার ভাঙ্গা নাও…..।’ আবার ‘ভব সিন্ধু পাড়ে……দয়াল পার কর আমারে…..।

‘ মানব মনের এই আধ্যাতিক চেতনার ব্যাকূল করা গান রচিত হয়েছে বাংলার নদীকে কেন্দ্র করে, যে গান গ্রাম বাংলার মানুষের কণ্ঠে চিরদিনই শোনা যায়। নীড় বাঁধার স্বপ্ন মানব মনে চিরন্তন। যে নদীর কূলে ঘর বেধে মানুষ বসবাস করে-সেই ঘর একদিন ভেঙ্গে যায় সর্বনাশা ঝড়ে আর নদী ভাঙ্গনেঃ ‘‘মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম বড়ই আশা করে সেই ঘর আমার ভাইঙ্গা গেল সর্বনাশা ঝড়েরে……মেঘনার সর্বনাশা ঝড়ে……। আবার এ নদী এক সময় শান্ত হয়। নতুন আশা নিয়ে ভালবাসা নিয়ে এই নদীর কূলেই আবার মানুষ তার ঘর বাঁধে। নদী যে আমাদের জীবনে সর্বত্র একাকার হয়ে মিশে গিয়েছে।

‘‘রূপালী নদীরে……. রূপ দেখে তোর হইয়াছি পাগল…….।’’ ‘‘ঝির ঝির হাওয়ায় নৌকায় পাল তুলে দে…….।’’ ‘‘নাও ছাড়িয়ে দে, পাল উড়ায়ে দে……..।’’ মানব জীবনে সুখ দুঃখ হয়তো পালাক্রমে আসে। তাই মানুষ সুখের আশায় তার জীবন তরী বেয়ে যায়। ‘‘দুঃখ সুখের দোলায় দোলে ভব নদীর পানি……., ও তুই সুখের আশায় বেয়ে যা তুই আশার তরী খানি……।’’ মাঝি ত তার তরী বেয়ে চলেছে। বহমান নদী যে কতদূর গিয়েছে মাঝি কি তার খবর রাখে? ‘‘উজান গাঙের নাইয়া……ভাটির গাঙের নাইয়া…….তুই কইবার নি পার নদী গেছে কতদূর।’’

কোন এক নববধূ বাপের বাড়ির স্মৃতি নিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে নদীর মাঝিকে জানাচ্ছে তার মনের ব্যাকুলতা। ‘‘কে যাও রে ভাটির গাঙ বাইয়া……..আমার ভাইজানের কইও খবর নাইওর নিতো আইয়া…..এবার যদি না নেয় নাইওর নায়ে ছইয়া দিয়া, দু’দিন বাদে আইতে কইও বাশের পালং লইয়া।’’

বৃহত্তর ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চলে এই গানটি পল্লী জীবনে আজো জনপ্রিয়। বিশাল ও কূল কিনারা বিহীন নদীতে চলমান উদাস মাঝির কণ্ঠো শোনা যায়ঃ ‘নদীর কূল নাই…..কিনার নাইরে ও আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাই…..কাহারে শুধাই রে……।’’

পল্লী কবি জসিমউদ্দিনে লেখায় বেদেজীবন আর পদ্মা নদীর কিছু কথা এসেছে এই গানেঃ ‘ও বাবু সেলাম বারে বার…… আমর নাম গয়া বাইদ্যা, বাবু বাড়ী পদ্মার পাড়……।

এই পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, মধুমতি, ধানসিড়ি হাজার নদীর মধুময় স্মৃতি বাঙালির মনকে বার বার উদাস করে। ‘‘এই পদ্মা, এই মেঘনা, যমুনা সুরমা নদীর তটে আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায় এ আমার দেশ এ আমার প্রেম, কত আনন্দ বেদনার মিলন বিরহ সংকটে…….।

নদীর ঘাটে জল ভরনে আসা রমণীর কাখের কলসি যদি মাঝি নৌকার ঢেউ লেগে ভেসে যায় তখন হয়তো রমণীর কণ্ঠে শোনা যায়ঃ ‘‘(আমার) কাখের কলসি গিয়াছে ভাসি, মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া……।’’

আধ্যাতিক চেতনায় নিমগ্ন মরমী কণ্ঠ শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যায় ঃ ‘মন মাঝিরে তোর বৈঠানেরে……আমি আর বাইতে পারলাম না……।’ দেহ রূপ নদীতে মনরূপ মাঝি অথৈই নদীতে কিসের অনুসন্ধানে যেন ক্লান্ত হয়ে যায়। সে তার চেতনার বৈঠা আর বাইতে পারে না।

অমর কণ্ঠ শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানঃ ‘ও নদীরে একটি কথাই শুধাই শুধু তোমারে…… বল কোথায় তোমার দেশ, তোমার নাই কি চলার শেষ……।’

প্রখ্যাত কণ্ঠ শিল্পী ভূপেন হাজারকিার গানঃ ‘গঙ্গা আমার মা…….পদ্মা আমার মা…….. ও আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা।’

বিখ্যাত সংগীত শিল্পী মান্না দের গানঃ ‘এই কূলে আমি, আর ঐ কূলে তুমি…..। মাঝখানে নদী ঐ বয়ে চলে যায়…….।’

প্রেমের কবি, যৌবনের কবি আর বিদ্রোহী কবি নজরুলের লেখা গানে বার বার এসেছে নদ নদী প্রসঙ্গ ঃ ‘নদীর এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে এইতো নদীর খেলা…..।’ ‘পদ্মার ঢেউরে……… মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা রে……।’ আজি মধুর বাশরি বাজে……. গোমতীর তীরে পাতার কুটিরে……।’ ‘কাবেরী নদী জলে কে গো বালিকা আনমনে ভাষাও চম্পা শেফালিকা………। ‘রেবা নদীর বিজন তীরে …..।’ তীরে মালবিকার দেশে……।’ ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা,নাচে তীরে খঞ্জনা…….।’ নীল যমুনা সলিল কান্তি…….। ‘ওরে নীল যমুনার জল বলরে মোরে বল…….।’ ‘শাওন রাতে যদি, স্মরণে আসে মোরে…….। ‘আমার গহীন জলের নদী……..।’ ‘আমি তোমার জলে রইলাম ভেসে জনম অবধি………।’ ‘গঙ্গা সিন্ধু নর্ম্মদা কবেরী ওই ‘বহিয়া চলিছে আগের মত কইরে আগের মানুষ কই………।’ ‘‘আমার সাম্পান যাত্রী লইনা ভাঙ্গা আমার তরী…….’ আমার দেউলিয়া করেছে ভাই যে নদীর জল’’ ‘আমার কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী…….., এ কোন সোনার গায়…….।’

বিশাল পদ্মানদী রবি ঠাকুরের জীবনের সঙ্গে যেন একাকার হয়ে মিশে গিয়েছে। ‘হে পদ্মা আমার তোমার আমার দেখা শতবার……..।’ ‘ওগো নদী আপন বেগে পাগল পাড়া……।’ নদী পারের এই আষাড়ে প্রভাব খানি নেরে ও মন নেরে আপন প্রাণে টানি……। আমি ঢালিব করুনা ধারা আমি ভাঙ্গিব পাষাণ করা……ইত্যাদি।

নদ-নদীকে নিয়ে লেখা ও এসব হৃদয়স্পর্শী গান বাংলার মানুষকে চিরদিনই ব্যাকুল করে। কবি-সাহিত্যিক কণ্ঠ শিল্পীদের লেখায় ও গানে নদীর কথা এসেছে বারবার। আববাস উদ্দিন, আব্দুল আলীমসহ আরো অনেক কণ্ঠ শিল্পীর গানে নদী যেন বার বার দোলা দিয়ে যায় আমাদের হৃদয় মনকে।

বাংলার নদী শুধু নদীই নয়, নদী এদেশের প্রাণের স্পন্দন। শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি আর সঙ্গীতের বাহন। এ সকল সঙ্গীতের সুরের মুর্ছনায় কিছুক্ষণের জন্য হলেও থেমে যায় শ্রোতার চলার গতি, হাতের কাজ আর জটিল-কুটিল বৈষয়িক চিন্তা ভাবনা।

 

লেখকঃ মো. ওমর হোসেন সিদ্দিকী, কৃতজ্ঞতায়ঃ  বাংলাদেশ পাবলিকেশন লিঃ

Posts Carousel

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos

Scroll Up