জোছনা’র আলো’য় দামতুয়া   

জোছনা’র আলো’য় দামতুয়া   

মো.জাভেদ হাকিম #  তুক-অ-দামতুয়া,নামের মাঝেই রয়েছে অদ্ভুদ এক রহস্যময় আকর্ষণ। তার উপর এটি একটি ঝর্ণার নাম। এমনিতেই পাহাড় প্রেমিদের ছোট-বড় যে কোন ঝর্ণার প্রতিই রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা। আর সেটা যদি হয় দৈত্ব্যাকার আকৃতির তাহলেত আর কোন কথাই চলে না। বান্দরবানের গহীনে লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকা তুক-অ-দামতুয়া, বছর তিনেক হল সাধারণ পর্যটকদের ভ্রমণ সূচীর আলোচনায় এসেছে।

  • মো.জাভেদ হাকিম # 

তুক-অ-দামতুয়া,নামের মাঝেই রয়েছে অদ্ভুদ এক রহস্যময় আকর্ষণ। তার উপর এটি একটি ঝর্ণার নাম। এমনিতেই পাহাড় প্রেমিদের ছোট-বড় যে কোন ঝর্ণার প্রতিই রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা। আর সেটা যদি হয় দৈত্ব্যাকার আকৃতির তাহলেত আর কোন কথাই চলে না। বান্দরবানের গহীনে লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকা তুক-অ-দামতুয়া, বছর তিনেক হল সাধারণ পর্যটকদের ভ্রমণ সূচীর আলোচনায় এসেছে। দক্ষ গাইডের অভাবে এতদিন যাই যাই করেও যাওয়া হয়নি। তাই বলে হাল ছাড়িনি। নানান জনের কাছে খোঁজখবর নিতে নিতে মিলে যায় দক্ষ গাইডের সন্ধান। ব্যাস আর পায় কে? দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা হাড়ি-পাতিল আর বোস্কা নিয়ে ছুটলাম। রাতের গাড়ীতে চরে খুব ভোরে গিয়ে নামলাম চকোরিয়া।তারপর চান্দের গাড়ীতে আলীকদম উপজেলার সতরে কিলো নামক জায়গার পথে। আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথে ড্রাইভার নাজেমের গাড়ি চলে হেলিকাপ্টারের ভাবসাবে। আড়াই ঘন্টার পথ চলতে, কখনো কখনো মনে হয়েছে এই বুঝি চান্দের গাড়ি উড়াল দিল আকাশে।

দশ কিলো থ্যিঙ্কু পাড়া এসেইে কষে একখান ব্রেক। আর্মি চেকপোস্টে সবার নাম ঠিকানা এন্ট্রি করতে গিয়ে বাধল কিছুটা বিপত্তি। অতঃপর নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত গ্রুপের সবার দায়িত্ব নিজ কাঁেধ নেয়ায় যাবার অনুমতি মিলল। আবারো গাড়ি ছুটল,অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাই সতেরো কিলো। গাইড মেন্থন আগেই সেখানে হাজির ছিল । পরিচয় পর্ব শেষে তার পিছুপিছু হাঁটি। যাচ্ছি আদু পাড়ার অভিমুখি। পাড়ায় গিয়ে তার ঘরে বাড়তি মালছামানা রেখে,পাহাড়ের পরম বন্ধু সাইজ মত বাঁশ নিয়ে ছুটি দামতুয়ার সান্নিধ্য পেতে। দেখতে হলে হাঁটতে হবে। যেমনটা জিততে হলে লড়তে হয়। এই লড়াই কিন্তু স্বভাবিক নয়। যা রিতীমত মনের সাথে দেহের লড়াই। মাথার উপর ভাদ্রের প্রখর রৌদ্র,দুচোখের সামনে শুধুই উঁচু উঁচু পাহাড়।হাঁটছি,উঠছি,নামছি মাঝে মধ্যে ঝিরির পানি চোখে-মুখে ছিটিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছি। ভাগ্যিস বাতাস ছিল বেশ। সেই সঙ্গে দুষ্ট রাকিব আর মিষ্টি ছেলে হাসিবের বাংলা ছবির প্রয়াত কৌতুক অভিনেতা দিলদার আর রবিউলের মত অফুরন্ত চুটকির ভিড়ে,দেহের ক্লান্তি পালিয়েছিল পাহাড়ের গভীর খাদে। ট্র্যাকিং করে যাওয়া আর দূর পাহাড়ের নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য মনের শক্তি বাড়িয়েছিল বহুগুন। নানান হাস্যরস্যের মাঝেই প্রায় তিনঘন্টা হাইকিং-ট্র্যাকিং শেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কানে ভেসে আসে ঝর্ণার মাতাল করা রিমঝিম শব্দের ছন্দ।কিন্তু চোখের সামনে চিকন চিকন বাঁশ গাছ ঘেরা খাড়া পিচ্ছিল পথ। নামতে হবে নীচের দিকে। একটু এদিক সেদিক হলেই সূচালু বাঁশ যে দেহের কোথায় গিয়ে সজোরে ঢুকবে তা কে জানে। এতক্ষণ যে ইফতেখার বাহাদুর ছিল সে এখন বাঁশের ভয়ে পুরোই কুকড়ে গেছে। সব মিলিয়ে ধারেকাছে এসে অস্থির সময়। তবুও পেতে হবে দামতুয়ার কোমল পরশ। আমার একশো দশ কেজির দেহটা মানিক ও হাসিবের সহযোগিতায় নীচে নামতে থাকল। নেমেত পুরাই থ’ হয়ে গেলাম। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। বিশালাকৃতির ঝর্ণা। দুই পাশ থেকেই পানি গড়িয়ে পরছে। পুরাই বুনো এক পরিবেশে দামতুয়া’র অবস্থান। ঝর্ণার উচ্চতা আনুমানিক প্রায় নব্বই হতে একশো ফিট হবে। বর্ষা শেষে শরৎ-এও তুক-অ-দামতুয়া’র যৌবন কমেনি।সারা বছরই এই ঝর্ণায় পানির প্রবাহ থাকে।আশ্চর্যের বিষয় বেশী পানি পরার পাশ হতে অল্প পানি গড়িয়ে পরার অংশের পানি অনেক বেশী ছিল শীতল। বেশ উচ্চতা আর অনেকখানি জায়গা জুড়ে প্রচন্ড বেগে পানি নেমে আসার কারণে ঝর্ণার সামনে বিশাল জলাশয় তৈরী হয়েছে। যেখানে অনায়াসেই সাতার কেটে জলকেলিতে মাতা যায়। সবাই যখন ডুব সাতারে উৎফুল্ল, তখন ছবির ছৈয়াল তুহিন ক্যামেরা হাতে মহা ব্যতি ব্যস্ত। আর না হয়েই বা কি করার আছে।এরকম নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সান্নিধ্যত আর চাইলেই পাওয়া যায় না।তাই যতটা সম্ভব ভ্রমণ সঙ্গী ও প্রকৃতির বিশেষ মহুর্ত গুলো ফ্রেম বন্দী করে রাখছে।

স্যোশাল মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারলাম বান্দরবান জেলার সব গুলো ঝর্ণার চাইতে, দামতুয়া’ই নাকি সব চাইতে বড় আকৃতির। আমার কাছেও তাই মনে হয়েছে। তুক-অ-দামতুয়া শব্দের অর্থটাও বেশ চমৎকার। এটি একটি মুরং ভাষা। তাদের ভাষায় তুক অর্থ ব্যাঙ, অ’ অর্থ ঝিরি আর দামতুয়া মানে খাড়া। সব মিলিয়ে ব্যাঙ/মাছ এখান হতে উপরে উঠতে পারে না। তাই এর নামকরণ তুক-অ-দামতুয়া। আমাদের গাইডও ছিল একজন মুরং। বেশ সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবাপন্ন মানুষ। যাই এবার দে-ছুট এর চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী ঝর্ণার উৎস দেখতে। আবারো চরাই-উৎরাই শেষে প্রাকৃতিক সবুজে ঘেরা ঝিরির দেখা পাই। বড় বড় কিছু পাথুরে বোল্ডার পেরিয়ে একেবারে ঝিরির পানিতে পৌঁছাই। বেশ চমৎকার একটা জায়গা। এই ঝিরি থেকেই পানি দামতুয়া’তে যায়। নাম হল ব্যাঙ ঝিরি। সাধারণত ঝিরির নাম অনুসারেই ঝর্ণা গুলোর নাম হয়ে থাকে। যেটা ট্র্যেকারদের ভাষায় আপার স্ট্রিম। ব্যাঙ ঝিরির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সময় জ্ঞান ভুলে যাই। টনক নড়ে যখন গাইড হাকডাক শুরু করে। কি আর করা, পাহাড়-জঙ্গলের গহীনে একজন গাইডই তখন ক্যাপ্টিন। সুতরাং তার নির্দেশনায় আদুপাড়ার পথ ধরি।ইস আবারো বহু পথ চড়াই-উৎরাই।গাইডের তথ্য মত প্রায় নয় মাইল। হাটঁতে হাটঁতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। এমনিতেই পাহাড়ে সন্ধ্যা আসে ঝুপ করে।ওদিকে রফিক ভাইর তাড়া।রাতের রান্নার দায়িত্ব তার ঘাড়েই পড়েছে। কারো পেটেই দুপুরে শুকনো দুই-চার পিছ বিস্কুট ছাড়া তেমন কিছুই পড়েনি।তাই বেচারি ছিল বেশ টেনশনে।যদি খিচুড়ি মজা না হয় তাহলে আজ দে-ছুট এর দামালেরা না জানি তার মাথায়ই ঢালে।আমি অভয় দেই।কারণ হাঁটছিত ধীরে ধীরে আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই। কাউকে বুঝতে দিচ্ছি না। উদ্দেশ্যত ভিন্ন, আজকের রাত পূর্ণীমা। পাহাড়ের নির্জনতায় ভরা জোছনার আলো সঙ্গী করে হাঁটব। পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।তাই আমি মনে মনে কিছুটা এক্সসাইটেড। এক ঠিলে দুই পাখি। এরকম সুযোগ সব সময় মিলে না। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। আকাশ ছোঁয়া পাহাড় টপকিয়ে গোলাকার চাদ যখন উঁিক দিল। ওয়াও! নিঝুম অন্ধকার পাহাড়ের চারপাশ আলোকিত হয়ে পড়ল। গাছের পাতা গুলো সবুজের মাঝে সোনালী বর্ণ ধারণ করল। অসাধারণ এক অনুভূতী। তখন সবার মাঝেই বিস্ময়ের আনন্দর ঢেউ খেলল। এতটাই আপ্লুত যে এখন আর কারো পাড়ায় ফেরার তেমন তাড়াহুরা নেই। তবুও ফিরতে হচ্ছে। পাহাড় ভ্রমণ শুধু যা দেখতে গিয়েছি তা দেখার মাঝেই যেন সীমাবদ্ধ না হয়। ভ্রমণ হল জীবনের অন্যতম শিক্ষার মাধ্যম। আর তা যদি হয় পাহাড়, তাহলেত আর কথাই নাই। পাহাড় ভ্রমণে প্রকৃতি হতে শুরু করে বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজের মানুষ গুলোর যাপিত জীবনযাপন হতেও অনেক নৈতিক শিক্ষা লাভ করার সুযোগ রয়েছে। তাহলে বন্ধুরা আজ এই পর্যন্তই। ইনশাআল্লাহ আগামী কোন এক সংখ্যায় আদুপাড়ায় রাতযাপন আর জুম ঘরের গল্প হবে।

যাবেন কিভাবেঃ 

ঢাকা হতে সরাসরি বান্দরবানের আলিকদম বাস যায়। টিকেট সঙ্কট হলে কক্সবাজারগামি বাসে চড়ে চকোরিয়া। সেখান হতে মটরবাইক/চান্দের গাড়িতে সরাসরি সতেরো কিলো এলাকায়।

গাইড পাবেন কোথায়ঃ

সতেরো কিলো এলাকার চা’য়ের দোকানীদের সাহায্য নিবেন।অথবা গাইড মেন্থনকেও নিতে পারেন।

খরচঃ

সাধারণত জনপ্রতি একদিনে প্রায় ৩৫০০-৪০০০ টাকা।

নির্দেশনাঃ

ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি রাখবেন। দায়িত্ব প্রাপ্ত সেনা সদস্যদের বিধি নিষেধ অনুসরন করুন। পর্যপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার, খেজুর, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুদ রাখুন। উলঙ্গ/অর্ধউলঙ্গ কারো প্রতি টিপ্পনী কাটবেন না।

আবেদনঃ

অনুগ্রহ করে খাবারের অপচনশীল মোড়ক গুলো সঙ্গে নেয়া ব্যাগে করে নিয়ে আসুন। সম্ভব হলে অন্যদের ফেলে দেয়া মোড়ক গুলোও কুড়িয়ে পরিচ্ছন্ন করুন। মনে রাখবেন এই দেশ আমাদের সুতরাং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব।

ছবিঃ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

Posts Carousel

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked with *

Latest Posts

Top Authors

Most Commented

Featured Videos

Scroll Up